ঝিনাইদহের শৈলকূপায় গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের মাঝে তা বিতরণ না করায় মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি বিসিআইসি সার ডিলার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এই সুপারিশের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরেও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ওই ডিলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
গত ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার জেলা প্রশাসক এই প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। শৈলকূপার গাড়াগঞ্জ বাজারে বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় কেন্দ্রে স্থানীয় কৃষকেরা সার কিনতে গিয়ে তা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন। এর প্রতিবাদে তারা গাড়াগঞ্জ-শৈলকূপা সড়কে কাঠের গুড়ি ফেলে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে শৈলকূপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে শৈলকূপার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপসহকারী কৃষি অফিসার ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডিলার প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় কেন্দ্র থেকে কৃষকদের মাঝে সার বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেন। এরপর কৃষকরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই ডিলারের গোডাউনে ৩১০ বস্তা ইউরিয়া, ৪১০ বস্তা ডিএপি, ২৮২ বস্তা টিএসপি ও ১৫০ বস্তা এমওপি সার মজুত ছিল। পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও তা বিতরণ না করে কৃষকদের বিক্ষুব্ধ করে তোলা হয়েছে, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি অপচেষ্টা।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ এর ১৬. ১ ধারা অনুযায়ী মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজের ডিলারশিপ বাতিলের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে সুপারিশ করা হবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগেও গত ২৫ এপ্রিল ও ৪ আগস্ট অবৈধভাবে সার মজুত করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজকে দুই দফায় জরিমানা করেছিল। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এই ডিলার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. নায়েব আলী জোয়াদ্দার, যিনি ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। বর্তমানে তিনি সন্ত্রাস বিরোধী আইনের একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন এবং তার ভাতিজা ডিলারশিপের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
স্থানীয় কৃষক আজিবার আলী অভিযোগ করেন, ডিলারশিপের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সাধারণ কৃষকদের হয়রানি করেন এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লোকজনকে সার সরবরাহ করেন। শরিফুল ইসলাম নামে আরেক কৃষক জানান, গুদামে সার মজুত রেখে কৃষকদের জিম্মি করা হচ্ছে। তবে ডিলার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আনারুল দাবি করেছেন, সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দ পাওয়ার পর নিয়ম মেনেই সার বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, কৃষকদের নিজ নিজ ওয়ার্ডের সাব-ডিলারদের কাছ থেকে সার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পর তারা সড়ক অবরোধ করেন। উপজেলা কৃষি অফিসারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং সার বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজ অভিযোগ করেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কিছু ডিলার পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
তিনি এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সার মজুত রেখে কৃষকদের হয়রানি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
