জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মিরপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জুলাইযোদ্ধা মো. শাকিল আহম্মেদ। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি সাক্ষ্য প্রদান করেন।
শাকিল জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনে যোগ দেন। পরদিন ১৯ জুলাই মিরপুর স্টেডিয়ামের সামনে পুলিশ ও সিভিল পোশাকে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি রাস্তা আটকে রাখেন। তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে পুলিশ তাদের গালিগালাজ করে। এ সময় একজন পুলিশ সদস্য তার সামনে থাকা এক ব্যক্তির পেটে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করার হুমকি দেন।
এরপর তারা মিরপুর-১ নম্বরের দিকে সরে যান। প্রায় আধঘণ্টা পর মিরপুর আলোক হাসপাতালের পাশ দিয়ে পুনরায় মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন শাকিল। সেখানে তিনি পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজনকে আন্দোলনকারীদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে দেখেন। গুলিতে মোস্তাকিন বিল্লাহ নামে এক আন্দোলনকারী আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে যান।
শাকিল ও আরও দুজন তাকে উদ্ধার করে গলির ভেতরে নিয়ে যান। মোস্তাকিনের মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন যে মোস্তাকিন মারা গেছেন। এছাড়া আরও এক আন্দোলনকারীর পেটে গুলি লাগলে তাকে রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। শাকিল জানান, ওই ঘটনার ভিডিও তার কাছে রয়েছে।
৪ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাকিল বলেন, ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। সেখানে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিল। প্রতি দশ সেকেন্ড পরপর আন্দোলনকারীরা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে তিনি ফুটপাতে থাকা হকারদের একটি খাটের নিচে লুকিয়ে পড়েন।
হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখেন একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। তাকে উদ্ধারের জন্য খাটের নিচ থেকে বের হওয়ার সময় একটি গুলি শাকিলের বাম নিতম্ব দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর দিয়ে ডান রানের গোড়া দিয়ে বেরিয়ে যায়। ট্রাইব্যুনালে তিনি তার শরীরের ক্ষতস্থানগুলো প্রদর্শন করেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি সাহায্যের জন্য এগিয়ে যান এবং এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পরে আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে আলোক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শাকিল জানান, তিনি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের পাশাপাশি থাইল্যান্ডেও চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে তার পায়খানার রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ডায়লেশনের মাধ্যমে তাকে মলত্যাগ করতে হয়। তার ডান পায়ের প্রধান ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লাইগেশন করা হয়েছে এবং তিনি শক্ত খাবার খেতে পারেন না।
শাকিল দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং আনুমানিক ২৫ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গু হয়েছেন। ১৯ জুলাই কারফিউ জারির পর আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে কারফিউ জারির পেছনে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভূমিকা ছিল।
তাদের একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। নিজের শারীরিক অবস্থা এবং আন্দোলনে নিহত ও আহতদের জন্য তিনি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে দায়ী করেন এবং তাদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, তাদের নির্দেশনায় মিরপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তারা নির্যাতন বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি।
