দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও আগস্ট মাসে পণ্য রপ্তানি ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) মঙ্গলবার এই হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে মোট ৪৪৩ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের আগস্ট মাসে ছিল ৩৯১ কোটি ডলার।
তবে জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে রপ্তানি প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। জুলাই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭৩ কোটি ডলারের পণ্য। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে মোট ৯১৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য—এই পাঁচটি প্রধান খাত থেকে। আগস্ট মাসে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ছাড়া বাকি চারটি খাতেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের ভালো পারফরম্যান্স সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ইপিবির তথ্যমতে, আগস্ট মাসে ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আগস্ট মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং এই খাত থেকে ১৩ কোটি ডলার আয় হয়েছে।
এছাড়া পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ২২ শতাংশ বেড়ে ৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং হোম টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি ৮ শতাংশ বেড়ে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি গত দুই মাস ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। আগস্ট মাসে এই খাতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।
জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে এই খাতে মোট ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শিল্পকারখানায় জ্বালানিসংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আগস্ট মাসের অধিকাংশ সময় বস্ত্রকলগুলো গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ঠিকমতো চালিয়ে নিতে পারেনি। এর ফলে অনেক রপ্তানিমুখী কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ ও সময়মতো পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পুরো আগস্ট মাস স্পিনিং ও ডায়িং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও তৈরি পোশাক, বিশেষ করে নিট পোশাকে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়াটি কিছুটা অপ্রত্যাশিত। এই প্রবৃদ্ধির কারণগুলো নিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সামগ্রিকভাবে, জুলাই মাসে রপ্তানি দশমিক ৯০ শতাংশ কমে গেলেও আগস্ট মাসে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের রপ্তানি খাত।
