বিদ্যুৎ বিভাগ সম্প্রতি বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উৎসাহিত করতে একটি বিশেষ প্রণোদনা নীতি ঘোষণা করেছে। সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা তাদের নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারবেন।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান বাজারদর ও উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এই ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কমানো এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। সরকারের এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গ্রাহক প্রথমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করবেন এবং ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
ডিপিডিসি, ডেসকো ও আরইবির মতো বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সুনির্দিষ্ট মিটারের মাধ্যমে এই হিসাব সংরক্ষণ করবে। প্রণোদনার অর্থ সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি রোধে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং মিটার অবশ্যই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (শ্রেডা) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
কারিগরি সহায়তার জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেখানে কৃষি জমি অত্যন্ত মূল্যবান, সেখানে অব্যবহৃত ছাদগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। শিল্পকারখানার বিশাল ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারবে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।
এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, জার্মানি, ভিয়েতনাম, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ভিয়েতনাম স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশও একই ধরনের মডেল অনুসরণ করে জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে এগোতে চায়। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ গ্রাহকদের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হতে পারে, তাই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সহজ শর্তে ও কম সুদে গ্রিন লোন বা সবুজ ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এছাড়া, হাজার হাজার ছাদ থেকে আসা বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর করা জরুরি। গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজ স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা এই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার রোধে বিএসটিআই ও শ্রেডাকে কঠোর তদারকি বজায় রাখতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের অবদান রাখবে। আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় হবে। এই উদ্যোগের ফলে সোলার প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া, গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে। সরকার আশা করছে, এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং বাংলাদেশ একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।
