১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহরকে। দ্রুত তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিন দশক পর আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে তার মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো।
দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং একাধিক তদন্তের পর বর্তমানে এই ঘটনাটি একটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনাটি প্রথমে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। তবে ১৯৯৭ সালে সিআইডি-র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে হত্যার অভিযোগ করে আসছে। ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয় এবং ২০১৪ সালে দাখিল করা প্রতিবেদনে মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
২০১৫ সালে সালমানের মা নীলা চৌধুরী পুনরায় রিভিশন আবেদন করেন। এর ফলে ২০১৬ সালে আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই-কে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২০ সালে পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে জানায়, পারিবারিক কলহ এবং মানসিক যন্ত্রণার কারণে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে, যার মধ্যে শাবনূরের সঙ্গে অতি-অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, মায়ের প্রতি অভিমান এবং সন্তান না হওয়ার কারণে অপূর্ণতা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে শাবনূর এই অভিযোগ অস্বীকার করে সালমান শাহরকে তার সহশিল্পী ও বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২১ সালে পিবিআই-র প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করেন। এর ফলে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন ২১ অক্টোবর তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এই মামলায় সামিরা হক, লতিফা হক লুসি এবং অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ আরও বেশ কয়েকজন এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে সালমান শাহরকে হত্যা করেছেন এবং তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
সম্প্রতি এই মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন-এর গ্রেফতারের পর। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে জানান, ডন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।
এছাড়া এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহরকে হত্যার চুক্তির কথা আদালতে জানানো হয়েছে।
সিআইডি বর্তমানে এই মামলার তদন্ত করছে। গত ২৭ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ডনের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সিআইডি-র দাবি, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হতে পারে এবং অন্যান্য জড়িতদের শনাক্ত করা যেতে পারে। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ থাকলেও, প্রতিবেদনটি জমা না হওয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, অতীতে একাধিক তদন্ত এবং প্রতিবেদন হয়েছে এবং পরিবারটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রিভিশন আবেদন করেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমান তদন্তে পুরোনো তদন্তের নথি এবং ১৬৪ ধারার জবানবন্দিগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সালমান শাহর ভক্তরা আদালতের সামনে মানববন্ধন করে খুনিদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
