চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, তাঁর দায়িত্ব পালন এবং মেয়রের মেয়াদকাল নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেছেন, জামায়াতের আমিরের এই মন্তব্য পরোক্ষভাবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার শামিল।
বর্তমানে কানাডায় অবস্থানরত মেয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা প্রচারের মাধ্যমে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের একটি লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনের মেয়াদকাল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
শফিকুর রহমান সমাবেশে বলেন, আগের সরকার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করছে। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে একজন মেয়র আছেন যিনি যত দিন ইচ্ছা তত দিন ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছেন। জামায়াতের আমির এ সময় প্রশ্ন রাখেন, এটি সুশাসন নাকি ফ্যাসিবাদ।
তিনি মেয়রকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি যেন পুনরায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। জামায়াতের আমিরের এই বক্তব্যের পরপরই মেয়র শাহাদাত হোসেন ভিডিও বার্তায় তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে মেয়র হিসেবে বিজয়ী করেছিল।
শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, ওই নির্বাচনে জনগণের রায় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যার প্রতিবাদে তিনি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন। সেই রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করলে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর তিনি মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, আদালতের রায় অনুযায়ী তাঁর বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। তিনি দাবি করেন, জামায়াতের আমিরের মন্তব্যের মাধ্যমে বিগত পাঁচ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অথচ আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগের মেয়রের নির্বাচন এবং তাঁর মেয়াদ অবৈধ ছিল।
মেয়র শাহাদাত হোসেন জানান, জনগণের প্রত্যাশিত রায় পাওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘ তিন বছর আইনি লড়াই চালিয়েছেন। এই লড়াইয়ের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে ১১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে এবং জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে যখনই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা হবে, তিনি তখনই পদ থেকে পদত্যাগ করবেন।
তিনি গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান এবং এ বিষয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই বলে মন্তব্য করেন। শাহাদাত হোসেন বলেন, অতীতে বিএনপির শাসনামলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একটি বিশ্বাসযোগ্য, গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সবারই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং তিনি সেই অধিকারকে সম্মান করেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে। এরপর ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীর নির্বাচন বাতিল করে শাহাদাত হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তিনি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেয়র শাহাদাত হোসেনের এই বক্তব্য চট্টগ্রামসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে জামায়াতের আমিরের লংমার্চ কর্মসূচিকে ‘লং ড্রাইভ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং নিজের অবস্থান ও আইনি ভিত্তি নিয়ে পুনরায় দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই দায়িত্ব জনগণের সেবার জন্য এবং তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল।
