চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকায় একটি কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে হঠাৎ ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৭ জুলাই এই এলাকায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দুই দিনে অন্তত ১৭ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং এই ঘটনায় আবদুল মতিন নামের ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়।
কলোনির বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের পানি সরবরাহের ট্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার ছিল এবং ট্যাংকের ভেতরে মৃত ইঁদুর ও তেলাপোকা পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা কলোনিতে গিয়ে ট্যাংকের পানি পরীক্ষা করেন এবং তাদের ধারণা, অপরিচ্ছন্ন ট্যাংকের পানি থেকেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই ঘটনার পাশাপাশি চট্টগ্রামে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ১১ জন গবেষকের দল একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অনিরাপদ ও লবণাক্ত পানি, পানির সংকট, দুর্বল স্যানিটেশন এবং পানি বিশুদ্ধ না করার অভ্যাস এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে।
এই গবেষণাটি গত ২৫ জুলাই আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলের সদস্য ইমামুল মুনতাসির জানান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি থেকেই যাবে। তিনি আরও বলেন, নলকূপ ও পুকুরের পানিতে দূষণের চিত্র পাওয়া গেছে এবং কিছু পুকুরে শৌচাগারের বর্জ্য সরাসরি মিশে যাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে।
গবেষণাটি ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ওই সময়ে চট্টগ্রামে তীব্র ডায়রিয়ায় ৭ হাজার ৯৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে পটিয়ায় ১ হাজার ৫৯৬ জন, বোয়ালখালীতে ১ হাজার ৮৭ জন, আনোয়ারায় ১ হাজার ৩৯ জন এবং চন্দনাইশে ১ হাজার ৩৩ জন ভর্তি হন।
এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৩৩৪ জন এবং বিআইটিআইডিতে ১ হাজার ৮৬৭ জন ভর্তি হন। গবেষকেরা জানান, রোগীদের নমুনায় মহামারি সৃষ্টিকারী ‘ও ১ ও গাওয়া’ ধরনের জীবাণু পাওয়া গেছে। তবে রোগী ও পানিতে পাওয়া জীবাণুর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক যাচাইয়ে জিনগত পরীক্ষা করাなかったので, গবেষকেরা নির্দিষ্ট কোনো একটি পানির উৎসকে রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেননি।
বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডীর তিনটি নলকূপ এবং পাঁচটি পুকুর থেকে নেওয়া নমুনায় বিপুল পরিমাণ কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরিবেশ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, একটি নলকূপের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ৮ লাখ ৮০ হাজার কলিফর্ম ছিল। এছাড়া পাঁচটি পুকুরের সবকটিতেই কলিফর্ম পাওয়া গেছে এবং একটি পুকুরে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ২ লাখ ৩০ হাজার কলিফর্ম ছিল।
গবেষকেরা আরও জানান, যে সব নলকূপ ছিল শৌচাগারের কাছাকাছি, সেগুলো দূষিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি ছিল। পশ্চিম গোমদণ্ডীর ৯৬ জন রোগীর মধ্যে ৮৩ শতাংশ মানুষ পানি বিশুদ্ধ না করেই ব্যবহার করতেন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মোট ২৬ হাজার ৬০২ জন ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়েছেন। মাসে গড়ে ৩ হাজার ৩২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং শুধু আগস্ট মাসে ২ হাজার ৭৮১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। গবেষকেরা বলেন, তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যায়, ফলে লবণাক্ততা ও নিরাপদ পানির সংকট বাড়ে।
এর ফলে মানুষ অনিরাপদ উৎস থেকে পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি জানান, পানিবাহিত রোগ ঠেকাতে সবার আগে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, গ্রামের নলকূপ বসানোর সময় শৌচাগার ও পয়োবর্জ্যেরর উৎস থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসাতে হবে এবং বাসাবাড়ির পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কোনো এলাকায় হঠাৎ ডায়রিয়া রোগী বাড়লে শুধু রোগীর চিকিৎসা করলেই হবে হবে না, বরং ওই এলাকার পানির উৎস ও স্যানিটেশনব্যবস্থা দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে।
গবেষক দলের সদস্য ইমামুল মুনতাসির বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ, পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্যানিটেশনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তিনি আরও বলেন, ডায়রিয়া-কলেরার ওপর চলমান রোগতাত্ত্বিক নজরদারির পাশাপাশি পরিবেশগত নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন।
