চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় মুহাম্মদ করিম নামের এক যুবদল কর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করেছে একদল সন্ত্রাসী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার কেরানীহাট বাজারে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মুহাম্মদ করিম বাজারে প্রবেশ করার সময় ৪-৫টি মোটরসাইকেলে আসা একদল সন্ত্রাসী তাঁকে ঘিরে ফেলে।
এ সময় সন্ত্রাসীদের একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় আঘাত করে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহত মুহাম্মদ করিম রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
তিনি দুই বছর আগে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম জানিয়েছেন, যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচিত থাকলেও মুহাম্মদ করিমের কোনো সাংগঠনিক পদপদবি ছিল না।
ঘটনার পর কেরানীহাট বাজারে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে এবং বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা সড়কের ওপর লাশ পড়ে থাকার পর পুলিশ এসে তা উদ্ধার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুরতহাল প্রতিবেদনে করিমের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাঁর পেটে, ঊরুতে ও নিতম্বে গুলি লেগেছে এবং একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
এছাড়া তাঁর ঘাড় ও কপালে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের আশেপাশে কোনো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা না থাকায় হামলাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করিম অতীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন এবং পরবর্তীতে প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফেরার পর তিনি হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজারে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে এবং তিনি একাধিকবার কারাভোগ করেছেন। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ঘটনার সময় বাজার এলাকা জনশূন্য থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। রাউজানে সাম্প্রতিক সময়ে এটিই প্রথম হত্যাকাণ্ড নয়। এর আগে গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে অন্তত ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে এলাকায় শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। বর্তমানে পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
