সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী আজ উদযাপিত হচ্ছে। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই তিথির মধ্যরাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শহর ও নগরের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে জন্মাষ্টমী উৎসবের আমেজ থাকে ভিন্নধর্মী। গ্রামগুলোতে এই উৎসবকে ঘিরে সনাতনী পরিবারগুলোতে বিশেষ প্রস্তুতি ও আয়োজন লক্ষ্য করা যায়।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গৃহবধূদের ব্যস্ততা থাকে চোখে পড়ার মতো। সকালে স্নান সেরে পুজোর সামগ্রী প্রস্তুত করা এবং ঠাকুর ঘরের সাজসজ্জা নিয়ে তারা ব্যস্ত সময় পার করেন। গোপাল ঠাকুরের প্রিয় ফুল, তালের পিঠা, সন্দেশ ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবারসহ ভোগের জন্য নানা ধরনের ফলের আয়োজন করা হয়।
জন্মাষ্টমীর অন্যতম প্রধান আচার হলো গোপাল ঠাকুরের স্নান বা অভিষেক। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পঞ্চামৃত ও গঙ্গাজল দিয়ে এই স্নান সম্পন্ন করা হয়। দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনির মিশ্রণে তৈরি পঞ্চামৃতের সাথে গঙ্গাজল ও শুদ্ধ জল ব্যবহার করা হয়। স্নানযাত্রার সময় ফুল ও তুলসি ব্যবহার করা হয় এবং মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
স্নান শেষে গোপাল ঠাকুরকে নতুন ধুতি, কুর্তা বা পশমের ওড়না পরানো হয়। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী হলুদ, সাদা, গোলাপি ও হালকা নীল রঙের পোশাককে শুভ বলে গণ্য করা হয়। এছাড়া মাথায় মুকুট, হাতে বাঁশি এবং পায়ে মল বা নূপুর পরিয়ে ঠাকুরকে পুজোর জন্য সাজিয়ে তোলা হয়।
গ্রামীণ সমাজে সংগীতায়োজনের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ আরও বৃদ্ধি পায়। গৃহবধূরা উলুধ্বনির মাধ্যমে সংগীত অনুষ্ঠান শুরু করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে গীতাপাঠ করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে গোপাল ঠাকুরের গুণকীর্তন ও অষ্টশত নাম পাঠ করা হয়। সবশেষে ভোজন আরতীর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। প্রসাদ গ্রহণের জন্য গ্রাম্য সমাজের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েন।
আয়োজকরা প্রথমে ভক্তদের মাঝে ভোগের প্রসাদ হিসেবে পঞ্চফল, পঞ্চমিষ্টি ও তালের পিঠা বিতরণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ঝোল খিচুড়ি, আলু ভাজি, বেগুন ভাজি, খাঁটি গরুর দুধের পায়েস এবং সবশেষে দই পরিবেশন করা হয়। জন্মাষ্টমী উৎসবের মূল ভিত্তি হলো গোবিন্দের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তি, জল, ফুল ও তুলসি দিয়ে পুজো করলেই গোবিন্দ সন্তুষ্ট হন।
তবে ভক্তদের শ্রদ্ধার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন ও উৎসবের আমেজ এই দিনটিকে আরও মুখর ও আনন্দঘন করে তোলে। গ্রামীণ জনপদের এই উৎসবগুলোতে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভক্তিভাবের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রতি বছরই এই তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ও মন্দিরে নানা আয়োজনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি পালন করে থাকেন।
