গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সিফাত আবদুল্লাহকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শুক্রবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সিফাত আবদুল্লাহ রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দা সিকান্দার আলীর ছেলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সিফাত দাবি করেছিলেন যে, তার বাড়িতে দুই মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এই অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ তুলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। সিফাতের এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ তাকে আটক করে। সিফাতের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান দাবি করেছেন যে, সিফাত দুই মাসের বিদ্যুৎ বিলের হিসাব তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চার মাসের হিসাব দেখিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
সিফাতের আইনজীবী অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিলের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সিফাতের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ডবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আহসান কবীর জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তদন্তে দেখা গেছে, সিফাতের দোতলা বাড়িতে মোট তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে।
সিফাতের পরিবার জুলাই ও আগস্ট মাসে মোট ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছে। পল্লী বিদ্যুতের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে মোট বিল এসেছিল ৬ হাজার ৪০৯ টাকা এবং আগস্ট মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৭২ টাকায়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, একটি বাড়িতে একাধিক মিটার থাকলে প্রতিটি মিটারের হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শুধু একটি মিটারের বিলকে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ খরচের মাপকাঠি হিসেবে ধরা যুক্তিযুক্ত নয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তদন্তের সময় তারা মিটারের রিডিং ও বিলের তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি বাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের তালিকা দেখতে চেয়েছিলেন। তবে সিফাতের পরিবার তদন্ত কাজে সহযোগিতা করেনি এবং তাদের বাড়ির ফটক বন্ধ করে দিয়েছিল।
বিদ্যুৎ বিলের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে ও জুন মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে মোট বিল এসেছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৯৭৬ টাকা এবং ২ হাজার ৬১৬ টাকা। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে, যার বিপরীতে মোট বিল এসেছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা।
সিফাতের বাড়িতে তার পরিবারের পাশাপাশি আরও দুটি ভাড়াটে পরিবার বসবাস করে। দোতলা ভবনটিতে তিনটি আবাসিক মিটারের সংযোগ রয়েছে। প্রথম মিটারে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে মোট ২ হাজার ৩৫৪ টাকা, দ্বিতীয় মিটারে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা এবং তৃতীয় মিটারে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা বিল এসেছে।
সিফাতের আইনজীবী আলী নাছের খান দাবি করেছেন যে, সিফাত শুধুমাত্র দুই মাসের বিলের হিসাব উল্লেখ করেছিলেন। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই মাসে তিনটি মিটারের সম্মিলিত বিল ১০ হাজার ৬৮১ টাকাই ছিল। সিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিফাতের বাসায় গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাড়ির ভেতর থেকে এক নারী জানান যে, এ বিষয়ে কোনো পুরুষ সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে পরবর্তীতে পরিবারের কোনো সদস্যের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সিফাত আবদুল্লাহ কারাগারে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিলের এই হিসাব নিয়ে সিফাতের পরিবার এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে আসায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, তারা তাদের দাপ্তরিক রেকর্ড অনুযায়ী বিলের হিসাব প্রদান করেছে এবং মিটারের রিডিং অনুযায়ীই গ্রাহকদের বিল পাঠানো হয়।
সিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করেছে। ঘটনার পর থেকে সিফাতের মুক্তির দাবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা-কর্মীরা থানায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বলে জানা গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন আইনগত প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
