গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীর ভাঙনে গত বুধবার থেকে তিন দিনের মধ্যে ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখি বিদ্যালয়ের উত্তরপাশে এই ভাঙন শুরু হয় এবং তীব্রতার কারণে ওই রাতে নিমিষেই ৬০টি পরিবারের বসতভিটা তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা বিলীন হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়।
১২টি পরিবারের সাতটি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ভাঙনের তোড়ে কিছু পরিবারের ঘরবাড়ি আংশিক ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। এই বিপর্যয়ের ফলে ভুক্তভোগী পরিবারের হাঁস-মুরগি এবং গাছপালাও নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে ওই এলাকায় আরও অন্তত দুই শতাধিক পরিবার চরম আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছে কারণ তাদের বসতভিটা ভাঙনের মুখে রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে এই এলাকাটি কয়েক দফায় তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে। গত ১৮ আগস্ট এই এলাকার চরের শিশুদের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে গত ১৬ জুলাই দুপুরে সেখানে আকস্মিক ভাঙন দেখা দিলে প্রায় ১০০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যায়।
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের রান্না বা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই এবং অনেকে উঁচু বাঁধ বা স্বজনের আঙিনায় অমানবিক অবস্থায় বসবাস করছেন। স্থানীয়দের দাবি, তাদের জরুরি ভিত্তিতে তাঁবু এবং শুকনো খাবারের প্রয়োজন।
কাপাশিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম জানান, তবে গত বুধবার রাত ৩টার দিকে তীব্র ভাঙন শুরু হয় এবং নিমিষেই ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা এবং হাঁস-মুরগিও নদীতে ভেসে গেছে। তিনি আরও জানান, যে ভাঙনের মুখে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষায় পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এই এলাকায় কাজ শুরু করেছে।
n
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি জানান, তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে তাৎক্ষণিকভাবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা সম্পন্ন হলে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, ওই এলাকায় ভাঙনের খবর পেয়েই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সংখ্যক জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে। স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, যে এসব জরুরি কাজ এবং জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে কাজের অনুমতি পাওয়া যায় না।
যখন ভাঙন শুরু হয়, তখন অনুমতি পেয়ে কাজ শুরু করা হয়।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লার চরের বাসিন্দা হায়দার আলী জানান, চরে সারা বছরই নদী ভাঙন হয় এবং অনেকের পূর্বপুরুষের বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, সবাই শুধু ভাঙন রোধে আশ্বাস দেয় কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর কাজ হয় না।
কাপাশিয়া ইউনionsের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম জানান, গত দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙনের পর কোনোমতে মাথা গুঁজে থাকার চেষ্টা করছিলেন। তবে এবার তার ঘরবাড়ি সব নদীগর্ভে চলে গেছে এবং তার শেষ সম্বলটুকুও তিস্তা নদী নিয়ে গেছে।
আতিয়ার রহমান নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বছরের পর বছর ধরে এই অবহেলা চলছে এবং স্থায়ী কোনো প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন যে, পানি উন্নয়ন বোর্ড কেবল তখনই কাজ শুরু করে যখন বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ গত ৮ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বসতিদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার অনুরোধ জানালেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, সময়মতো জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হলে এই ভাঙন রোধ করা সম্ভব হতো।
