ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপ সয়েল ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ রক্ষা করার লক্ষ্যে সরকার বিকল্প মাটির উৎস ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। চলমান খাল খনন কর্মসূচি থেকে উত্তোলিত মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করা যায় কি না, তা যাচাই করার জন্য একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে দেশের ছয়টি জেলায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা প্রদান করেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলাকে নির্বাচন করেছে। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে ইটভাটার সংখ্যা এবং খননযোগ্য খালের দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে এই স্থানগুলো বাছাই করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, এই ইটভাটাগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ছয় কোটি ঘনমিটার কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষিজমি রক্ষায় এই মাটি ব্যবহার কমানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়নের ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে খাল খননের মাটি ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। প্রথম ধাপে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের চারটি সংস্থা ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খননের কাজ শুরু করেছে। খাল খননের সময় উত্তোলিত মাটি অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পুনরায় নদী বা খালে গিয়ে পড়ে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এই মাটি ইটভাটায় সরবরাহ করা গেলে একদিকে যেমন কৃষিজমির মাটি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ড্রেজিং বা খনন কাজের খরচও কমে আসবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ইতিমধ্যে ইটভাটা মালিক সমিতি এবং খাল খননকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, খনন করা মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হবে।
মাটি শুকানোর পর তার মান যাচাই করে ইট তৈরির উপযোগী কি না, তা নিশ্চিত করা হবে। এরপর ইজারার ভিত্তিতে ইটভাটা মালিকদের কাছে এই মাটি সরবরাহের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খনন করা মাটি ইটভাটায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে তা ইটভাটা মালিকদের জন্যও সাশ্রয়ী হবে।
ইটভাটা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কৃষিজমির মাটি ব্যবহার না করে বিকল্প উৎস থেকে মাটি পাওয়া গেলে তারা তা ব্যবহারে আগ্রহী। বর্তমানে অনেক ইটভাটা মালিক পুকুর বা ডোবার মাটি ব্যবহার করছেন, যা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি উদ্যোগে কম মূল্যে মাটি সরবরাহ করা হলে ইটভাটা মালিকরা কৃষিজমির মাটি কাটার প্রবণতা থেকে সরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পরিবেশদূষণ রোধে মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরির প্রথা থেকে সরে এসে পাথর, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সরকারি প্রকল্পে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
শীতকালে নদী শুকিয়ে গেলে সেখান থেকেও মাটি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা কৃষিজমি ও পাহাড় কাটা রোধে সহায়ক হবে। সরকার আশা করছে, এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ইটভাটার কাঁচামালের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
