কবি আমিনুল ইসলাম তার কবিতায় মহানন্দা নদীকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির এক অনন্য আলেখ্য তৈরি করেছেন। তিনি তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ (২০০৪), যেখানে নদীটি কেবল একটি ভৌগোলিক জলধারা হিসেবে নয়, বরং মানবজীবনের প্রেম, বিরহ এবং ঐতিহ্যের এক মহাকাব্যিক আখ্যান হিসেবে ফুটে উঠেছে।
আমিনুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিসমৃদ্ধ চরাঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন। তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে পদ্মা, পাগলা, পাঙ্গাশমারী এবং মহানন্দা নদীর কোলঘেঁষে কেটেছে। এই নদীগুলোর প্রভাব তার কবিতায় মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর মগ্নতা তৈরি করেছে, যা বিশেষ করে মহানন্দা নদীর প্রবাহে শৈশবের নস্টালজিয়া এবং স্মৃতিকাতরতাকে জাগিয়ে তোলে।
কবির কাব্যিক ক্যানভাসে মহানন্দার শান্ত জলধি, বর্ষার রূপান্তর এবং চরের জনজীবন গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতায় নদীটি মহাজীবনের এক বিশাল আয়না হয়ে উঠেছে। তিনি এই নদীর ঘাটে ঘাটে প্রাচীন সভ্যতার পদচিহ্ন খুঁজেছেন এবং নদী অববাহিকার লৌকিক সংস্কৃতি, উপনিবেশ-বিরোধী চেতনা এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের লড়াইকে উত্তর-উপনিবেশবাদী দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আমিনুল ইসলাম পেশাগত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তবে এই বিশ্বভ্রমণ তাকে শেষ পর্যন্ত নিজের শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি ভিনদেশি নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছেন আপন মহানন্দার চরে। যমুনা পার হয়ে প্রাচীন নগরের ঠিকানা বা ব্যস্ত বন্দরের কোলাহলেও তার মনে মহানন্দার শান্ত সুর বেজে ওঠে, যা এই নদীকে আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নদীমাতৃক চেতনা প্রকাশের জন্য আমিনুল ইসলাম নিজস্ব এক শব্দবুনন তৈরি করেছেন। জল, পলি, নৌকা, ঘাট, এবং চরের অনুষঙ্গ তার কবিতায় চিত্রকল্প এবং প্রতীকের নতুন মাত্রা যোগ করে। তার ছন্দের সাবলীল প্রবাহ যেন মহানন্দা নদীরই বহমানতার প্রতিরূপ। নদী তার কাব্যের বহিরঙ্গ এবং অন্তরঙ্গ উভয় রূপকেই সমৃদ্ধ করেছে।
কবির কবিতায় পরিবেশগত চেতনা এবং সাবঅল্টার্ন দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। তিনি কেবল প্রেমের গুঞ্জন বা স্মৃতির রোমন্থন করেননি, বরং পরিবেশগত সংকটের এক নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নদী শুকিয়ে যাওয়া, চরের জমি দখল হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংকটকে তিনি তার কবিতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধে মহানন্দা নদীর অবদান এবং ইতিহাসও তার কবিতায় স্থান পেয়েছে। তিনি ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর-এর বীরবংশের উত্তরাধিকার হিসেবে মহানন্দায় বুক দেওয়া এবং রেহাইচরের ঘাটে স্বাধীনতার দৃপ্ত পায়ে পার হয়ে আসার কথা উল্লেখ করেছেন।
আধুনিকতার আগ্রাসনে এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ে নদী কীভাবে তার জৌলুস হারাচ্ছে এবং এর সাথে সাথে একটি জনপদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, তবে তা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি গ্রামীণ জীবনের অতি সাধারণ অনুষঙ্গকে বৈশ্বিক আধুনিক চেতনার সাথে মেলানোর চেষ্টা করেছেন।n
আমিনুল ইসলামের কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তার চিত্রকল্প। নদী, চর, সবুজের কাশফুল, মাছ ধরার নৌকা এবং চরের মানুষের মুখের ভাষাকে তিনি অলংকারে রূপ দিয়েছেন। তিনি গ্রামীণ জনপদের শব্দ, নদীর চরের মানুষের কথ্য ভাষা এবং প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষাগুলোকে কবিতার মূল স্রোতে মিশ্রিত করেছেন।n
জীবনানন্দ দাশের ‘ধানসিড়ি’ কিংবা আল মাহমুদের ‘তিতাস’ নদীর মতোই আমিনুল ইসলামের কাব্যবিশ্বের কেন্দ্রীয় ধমনী হিসেবে মহানন্দা নদী স্পন্দিত হয়েছে। তিনি মহানন্দা নদীকে বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী উপাদানে পরিণত করেছেন এবং একে একটি ক্ষীয়মাণ ঐতিহ্য, আঞ্চলিক আত্মপরিচয় এবং সোনালি অতীতের মহাকাব্যিক স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
