কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা এবং একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসিক চরিত্র এবং ক্ষমতার অসমতা অনেক সময় অপরাধের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যা প্রতিরোধ করতে হবে।
সামাজিক নজরদারি থাকলেও কওমি মাদ্রাসায় রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাব রয়েছে। সমাজ সাধারণত শিক্ষকের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং পড়াশোনার মান যাচাই করে, কিন্তু শিশু সুরক্ষার নির্দিষ্ট তদারকি ব্যবস্থা নেই। এর ফলে অনেক সময় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষমতার অসমতা তৈরি হয়, যা অসৎ ব্যক্তিরা শোষণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের পড়াশোনা, খাবার এবং ঘুমের মতো মৌলিক বিষয়গুলো একই কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই পরিস্থিতি অনেক সময় অপরাধের সুযোগ তৈরি করে। এটি প্রতিরোধ করতে শিক্ষক বা আবাসিক তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে রোটেশন এবং রাতের ডিউটির ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেক সময় 'গ্রুমিং' প্রক্রিয়া চলে, যেখানে অপরাধী শিশুর আস্থা অর্জন করে এবং পরে ভয় বা লজ্জার মাধ্যমে তাকে নীরব রাখা হয়। অভিযোগের পর অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বদলে শিশুর বিপরীতে দাঁড়ায়। স্থানীয় সালিস বা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে এই অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে আনা হয়, যা ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় যোগ্যতা যথেষ্ট নয়। তাদের শিশু মনোবিজ্ঞান এবং পেশাগত সীমারেখা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। নিয়োগের আগে পূর্ববর্তী কর্মস্থলের রেফারেন্স এবং অপরাধের ইতিহাস যাচাই করা উচিত।
মাদ্রাসার অভ্যন্তরে সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকর ব্যবহার এবং লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা বলা হয়েছে। তবে শোবার ঘর বা বাথরুমের মতো ব্যক্তিগত জায়গাগুলোতে ক্যামেরা বসানো উচিত নয়। শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে জানানো উচিত যে কোন আচরণ অনিরাপদ এবং কোন স্পর্শ অস্বস্তিকর।
অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সন্তানের আচরণগত পরিবর্তন এবং মাদ্রাসায় যেতে অনীহা লক্ষ্য করলে অভিভাবকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
কওমি বোর্ড এবং রাষ্ট্র সাথে সাথে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি অভিন্ন ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। আলেমদের সাথে শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী এবং আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
যে মাদ্রাসা অভিযোগ গোপন করবে বা অপরাধীকে পালাতে সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কওমি বোর্ডের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অভিযোগকারী শিশুর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং শিক্ষাজীবনে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় পর্যায়ের নিরপেক্ষ গবেষণার মাধ্যমে মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত যাচাই করে কার্যকর নীতি তৈরি করা সম্ভব। কওমি সমাজের নিজস্ব নৈতিক ঐতিহ্য এবং ন্যায়বিচারের শিক্ষা ব্যবহার করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
