ভিমরুলের আক্রমণ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। ভিমরুলের বিষে অ্যাসিটাইলকোলিন, ফসফোলাইপেস, হিস্টামিন, হায়ালুরোনিডেস, প্রোটিয়েস এবং বিভিন্ন ধরনের এনজাইমসহ নানা বিষাক্ত উপাদান থাকে। সাধারণত একটি বা দুটি ভিমরুলের কামড় সাধারণ যন্ত্রণাদায়ক হলেও, দলবদ্ধ আক্রমণ শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
ভিমরুলের বিষের প্রতি যাদের তীব্র অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে একটি বা দুটি কামড়েই অ্যানাফাইলাক্সিস নামক প্রাণঘাতী বিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় রোগীর রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, শ্বাসনালি ফুলে গিয়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং রোগী সংজ্ঞাহীন হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তিকে একসঙ্গে ২০টি বা তার বেশি ভিমরুল কামড়ায়, তবে শরীরে বিষক্রিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এই অতিরিক্ত বিষ রক্তের লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে ফেলে এবং পেশির টিস্যু নষ্ট করে দেয়। এর ফলে শরীরে যে বর্জ্য তৈরি হয় তা কিডনি বিকল করে দেয়, হৃদ্যন্ত্রে জটিলতা সৃষ্টি করে এবং যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভিমরুলের আক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া জরুরি।
ভিমরুল যেখানে আক্রমণ করেছে, সেই স্থান ত্যাগ করে দ্রুত কোনো বন্ধ ঘরে বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। যদি ত্বকে হুল ফুটে থাকে, তবে তা আলতো করে কার্ড বা চিমটা দিয়ে বের করে আনতে হবে। তবে কোনোভাবেই ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে বিষ বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
ক্ষতস্থান দ্রুত ক্ষারযুক্ত সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়া হুল ফোটানোর স্থানে বরফ বা ঠান্ডা পানি ব্যবহার করলে বিষের ছড়িয়ে পড়া ধীর হয় এবং ফোলা ও যন্ত্রণা কিছুটা কমে। বরফ কাপড়ে পেঁচিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট চেপে রাখা যেতে পারে।
তবে প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি। হাসপাতালে চিকিৎসকরা অ্যানাফাইলাকটিক শক প্রতিরোধের জন্য এড্রেনালিন ইনজেকশন ব্যবহার করেন, যা শ্বাসনালি খুলে দিতে ও রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে কার্যকর। প্রদাহ ও চুলকানি নিয়ন্ত্রণের জন্য শিরায় বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিহিস্টামিন ও কটিকোস্টেরয়েড ওষুধ দেওয়া হয়।
রক্তে মিশে থাকা টক্সিন বের করার জন্য প্রচুর পরিমাণে স্যালাইন বা ফ্লুইড থেরাপি দেওয়া হয় এবং শ্বাসকষ্ট থাকলে নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয়। যদি বিষের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে কিডনি বিকলের উপক্রম হয়, তবে দ্রুত ডায়ালাইসিস বা আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে। ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে রক্ত থেকে টক্সিন ছেঁকে বের করে নেওয়া হয়।
ভিমরুলের আক্রমণে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মুখ, ঠোঁট, জিহ্বা বা গলা অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা, শরীরে লাল চাকা ওঠা, তীব্র চুলকানি, বমি ভাব বা সংজ্ঞা হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। যাদের একবার ভিমরুলের কামড়ে তীব্র অ্যালার্জি হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পুনরায় আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘ভেনম ইমিউনোথেরাপি’ গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। অপচিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে সঠিক সময়ে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণই ভিমরুলের আক্রমণে জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
