ইসলাম ধর্মে মানুষের সঙ্গে সুন্দর ও পরিশীলিত সামাজিক আচরণ বজায় রাখাকে ইমানের অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং মার্জিত আচরণ করা একজন সচেতন মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব। আধুনিক সমাজে তরুণ প্রজন্মের জন্য শিষ্টাচার ও ভালো চরিত্র গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
দৈনন্দিন জীবনে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, কাজের ক্ষেত্রে দয়াশীলতা বজায় রাখা, অনুপযুক্ত ও অশোভন আচরণ পরিহার করা এবং মার্জিত ভাষার ব্যবহার একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। মহানবী (সা. ) নিজের নবুয়তি দায়িত্ব ও আগমনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন যে, তাকে কেবল উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।
আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থের ২৭৩ নম্বর হাদিসে এই শিক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। সুরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি নবীকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছেন। উত্তম চরিত্রের বিকাশই ইসলামের মহান বার্তার মূল ভিত্তি।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নিজের ইবাদত বা একত্ববাদের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সৎব্যবহার করতে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের সঙ্গে ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ করা যাবে না এবং তাদের ধমক দেওয়া যাবে না।
বরং তাদের সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানসূচক ও নম্র ভাষায় কথা বলতে হবে। শৈশবে অসহায় অবস্থায় মা-বাবা নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের গড়ে তোলেন। তাই সামর্থ্যবান হওয়ার পর তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। মা-বাবাকে সন্তুষ্ট রাখা পরকালের অন্যতম সেরা পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রবীণ ও মুরুব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করাও ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। রাস্তাঘাটে বা সামাজিক মেলামেশায় বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি বিনয়ী হওয়া এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কদর করা উচিত। বয়স্কদের সম্মান করা সম্পর্কে মহানবী (সা. ) সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেমদের উপযুক্ত মর্যাদা দেয় না, সে তার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সুনানে তিরমিজির ১৯১৯ নম্বর হাদিসে এই নির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে। বড়দের সঙ্গে হাঁটার সময় সামান্য পেছনে থাকা, দরজায় বা যানবাহনে প্রবেশের সময় তাদের আগে সুযোগ দেওয়া এবং তাদের উপস্থিতিকে সম্মান জানানো নবীজির শিক্ষা। আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত যে, অন্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে।
মানুষ নিজের জন্য যেমন আচরণ আশা করে, অন্যের সঙ্গেও তেমন আচরণ করা উচিত। একদিন সবাইকে বৃদ্ধ হতে হবে। আজ বয়স্কদের সঙ্গে যে আচরণ করা হবে, ভবিষ্যতে তরুণ প্রজন্মও তেমনই আচরণ করবে। সামাজিক মেলামেশায় হাসিমুখে কথা বলা এবং সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইমানের সৌন্দর্য। মহানবী (সা.
) বলেছেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ওই ব্যক্তি, যার চরিত্র বা আচরণ সবচেয়ে সুন্দর। সহিহ বুখারির ৩৫৫৯ নম্বর হাদিসে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুন্দর আচরণ ও উত্তম চরিত্র গঠনের মাধ্যমে একটি শান্তিময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, যা ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
