আবাসিক মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়ন এবং বলাৎকারসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা সামনে আসার পর দেশের আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আলেম ও ইসলামি আলোচক আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে অপরাধের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং এটি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।
তিনি শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) একটি ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে জানান যে, দায়িত্বশীল আলেম সমাজ যদি মনে করেন যে গোপনীয় বিষয় গোপন রেখেই এর সমাধান করা সম্ভব, তবে তারা ভুল করছেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ের ওলামায়ে কেরামদের একসঙ্গে বসে সঠিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করার অনুরোধ জানান। তার মতে, কিছু মানুষের ব্যক্তিগত অপকর্মের কারণে পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস সংকটে পড়েছে।
আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহর মতে, প্রতিটি মাদ্রাসায় একটি করে স্বাধীন অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বড়দের কথা শুনে চলা আদবের কথা হলেও, কোনো অন্যায় হলে তা জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকা প্রয়োজন। অপরাধের ঘটনা চেপে রাখার মাধ্যমে কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না বলে তিনি দাবি করেন।
বরং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ শুনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বিশেষ করে আবাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য দোতলা বা তিনতলা খাটের ব্যবস্থা করা উচিত অথবা সাধারণ চৌকির ব্যবস্থা করা উচিত। তার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষও এখন মাটিতে ঘুমায় না, এমনকি ২০০ টাকা দামের একটি চৌকি ব্যবহার করে।
অথচ অনেক বড় বড় বিল্ডিং এবং প্রতাপ থাকা সত্ত্বেও অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের মাটিতে ঘুমাতে হয়।
তিনি সতর্ক করেন যে, শিক্ষার্থীদের এক বা অন্য শিক্ষার্থীর সাথে গাদাগাদি করে মাটিতে ঘুমানোর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা মাটিতে থাকতে পারবে না। যদি কোনো মাদ্রাসার আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, তবে সেখানে অতিরিক্ত ছাত্র ভর্তি করা উচিত হবে না।
জাতীয় পর্যায়ের ওলামায়ে কেরামদের একটি গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করার দাবি জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন যে, শায়খ আহমদুল্লাহ একটি খোলা চিঠি লিখেছেন, যেখানে তিনি বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যারা ইসলাম পছন্দ করে না, তারা এই ঘটনাগুলোকে ইসলামের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা ইসলামপন্থীদের জন্য চিন্তার বিষয়।
আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ দাবি করেন যে, অপরাধের ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসার পর সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা পুরো জাতিকে জানাতে হবে। তিনি ঢাকঢাক-গুড়গুড় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার মতে, জুব্বা এবং টুপি পরলেই কেউ প্রকৃত অর্থে হুজুর হয়ে হয় না এবং এই পরিচয়ের আড়ালে এমন অনেকে আছেন যাদের অপরাধ সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
তিনি আরও বলেন, যারা এই ধরনের জঘন্য অপরাধে লিপ্ত, তারা নিজেদের ইসলামের অনুসারী দাবি করে। তাই তিনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে অপরাধীদের জন্য ইসলামী আইনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
সবশেষে তিনি আলেমদের রাজনৈতিক হিংসা এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই মৌলিক সংকটের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন যে, এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের ঘৃণা তৈরি হলে তা দূর করা হবে না। তিনি প্রচলিত আইনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানান।
