বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন যে, সরকার আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই আশ্বাসের কথা জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নেওয়া নতুন রুফটপ সোলার পলিসি এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত সিদ্ধান্তের ফলে আগামী গ্রীষ্মে দেশের মানুষকে বিদ্যুৎ ঘাটতিজনিত কষ্টে আর ভুগতে হবে না।
তিনি জানান, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কারিগরি সমস্যার সমাধান এবং সরকারের নেওয়া নতুন পদক্ষেপের ফলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও তা পূর্ণ মাত্রায় সচল রাখতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে পুরো গ্যাস সরবরাহ করা হলে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই অর্থনীতি সচল রাখতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া আদানির সঙ্গে চুক্তির আওতায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে ৯০০ এবং রাতে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। গত ২১ জুলাই এলএনজি সরবরাহকারী একটি এফএসআরইউ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, যার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে।
তবে বর্তমানে সংকটের প্রায় ৮৮ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা পূরণে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে চালু হবে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হলেও বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা দ্রুত বিতরণ করা হচ্ছে। মধ্যমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে সরকার রুফটপ সোলার বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন, তারা উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি এবং জ্বালানি আমদানিতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ছিল। বর্তমান সরকার জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজ করছে। তিনি দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
