মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর নাম পরিবর্তন করে নিজের নামে রাখার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করে ট্রাম্পকে ‘পাগল রাজা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্যান্ডার্সের মতে, হরমুজ প্রণালীর নাম পরিবর্তনের মতো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে ট্রাম্পের উচিত ইরান যুদ্ধ বন্ধের দিকে নজর দেওয়া।
স্যান্ডার্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, ট্রাম্প একজন প্রেসিডেন্ট, কোনো পাগল রাজা নন এবং তাকে সেই অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। স্যান্ডার্স আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর পড়ছে।
তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধের হুমকি এবং ক্ষমতার প্রদর্শন বন্ধ করে কূটনীতি ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার আহ্বান জানান। স্যান্ডার্সের এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় জর্জের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজা তৃতীয় জর্জ আমেরিকান উপনিবেশগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যার ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘ম্যাড কিং’ বা পাগল রাজা হিসেবে পরিচিতি পান।
স্যান্ডার্স মূলত ট্রাম্পের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে তুলনা করে সতর্ক করেছেন। এদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কারমানপুর জানিয়েছেন, গত ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফা বিমান হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।
এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১৪২ জন। হতাহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কারমানপুরের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী এবং ৪৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর। নিহতদের মধ্যে দুই নারী এবং এক শিশু রয়েছে। এই বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তারা কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, বাহরাইন এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। একদিকে ট্রাম্পের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সরাসরি সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই উত্তেজনা প্রশমনে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং উভয় পক্ষই সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে একে অপরকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে সামরিক আগ্রাসন বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
স্যান্ডার্সের মতো অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুদ্ধের এই পথ পরিহার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ট্রাম্পের প্রশাসন এবং ইরানের নীতিনির্ধারকরা এই সংঘাতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনার পথ আপাতত রুদ্ধ বলেই মনে হচ্ছে। তবে চলমান এই সামরিক অস্থিরতা যে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা স্পষ্ট।
