হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় ইরানি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবের একটি সুপারট্যাংকার। এই হামলায় জাহাজে কর্মরত ফিলিপাইনের দুই নাবিক নিহত হয়েছেন। বাহরি সিদর নামের এই সুপারট্যাংকারটি সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল বহন করছিল। সোমবার ৩১ আগস্ট রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজটি হামলার কবলে পড়ে।
একই সময়ে সৌদি আরবের মালিকানাধীন আরও একটি তেলবাহী সুপারট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এই হামলার ঘটনার পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জাহাজ কোম্পানি বাহরি জানিয়েছে, তারা আক্রান্ত জাহাজটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সামুদ্রিক খাতের অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তবে হামলায় নিহত নাবিকদের পরিচয় বা জাহাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে এটিই প্রথম হামলার ঘটনা নয়। এর আগেও সৌদি আরবের মালিকানাধীন জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসে বাহরির আরেকটি সুপারট্যাংকার ওয়েদইয়ান ওমানের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হয়েছিল। এছাড়া লোহিত সাগরেও সৌদি জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের নৌ অবরোধ ঘোষণার পর জুলাই ও আগস্ট মাসে মাসা ও আমজান নামের বাহরির আরও দুটি জাহাজ হামলার কবলে পড়েছিল।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জলপথে জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিতে এই ধরনের হামলা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরান বা অন্য কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য কাজ করছে। জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজের সুরক্ষার বিষয়টি এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য দেশের জাহাজগুলোকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জাহাজ কোম্পানি বাহরি জানিয়েছে, তারা তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় নৌ টহল জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়।
তাই এই জলপথে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
