হামের বৈশিষ্ট্যসূচক লাল দাগ বা র্যাশ শরীরে ফুটে ওঠার কয়েক দিন আগে থেকেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি এই ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে ভাইরাসের সংক্রমণের একটি নীরব পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন না যে তিনি হামে আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে তিনি অজান্তেই ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৩ হাজার ১৩৪ জন হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি গত তিন দশকের মধ্যে দেশটিতে হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি অঙ্গরাজ্য ও বিচারিক এলাকায় এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এই নীরব সংক্রমণের সময়কালটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাধারণত শরীরে লাল দাগ বা র্যাশ দেখা দেওয়ার প্রায় চার দিন আগে থেকেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রামক হয়ে ওঠেন। হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা চোখ দিয়ে পানি পড়া।
এই লক্ষণগুলো সাধারণ সর্দি বা ফ্লুয়ের সাথে মিলে যায়, যার ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে হাম শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই বিভ্রান্তির কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি স্কুল, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত চালিয়ে যান, যা ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া, আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কক্ষ ত্যাগ করার পরও সেই কক্ষের বাতাসে ভাইরাসটি দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সরাসরি সংস্পর্শ ছাড়াও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
হামের ক্ষেত্রে লাল দাগ বা র্যাশকে সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হলেও এটি রোগের শেষ পর্যায়ে দেখা দেয়। প্রাথমিক লক্ষণগুলো শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর সাধারণত মুখমণ্ডল ও মাথায় র্যাশ দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে তা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পরিবার, সহকর্মী এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতি টিকাদানের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে টিকাদানের হার কমে যাওয়া বিভিন্ন এলাকায় এই ভাইরাস পুনরায় ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে উচ্চমাত্রার টিকাদান কর্মসূচি বজায় রাখা অপরিহার্য। হাম, মাম্পস এবং রুবেলা বা এমএমআর টিকা একজন ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সমাজে ভাইরাসের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
নীরব সংক্রমণের এই সময়কালটি নির্দেশ করে যে, কেবল র্যাশ দেখে রোগ শনাক্ত করার ওপর নির্ভর করলে সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব নয়। যখন কারো শরীরে হামের লক্ষণ স্পষ্ট হয়, ততক্ষণে তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা হয়তো আগেই আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক থাকা এবং যথাযথ টিকাদান নিশ্চিত করাই এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
হামের ক্ষেত্রে র্যাশ না থাকা মানেই যে ভাইরাস ছড়াচ্ছে না, তা নয়। লক্ষণ প্রকাশের আগেই ভাইরাসটি সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
