সিরিয়া বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ২৯৯টি ইরাকি জ্বালানি ট্যাংকারের একটি বহর সিরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াসের দিকে যাত্রা শুরু করে। ২০০৩ সালের পর এটিই প্রথম ঘটনা, যখন ইরাকি তেল বৈধভাবে সিরিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পৌঁছাল।
এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি ইরাকি জ্বালানি এই পথে সিরিয়ার উপকূলে স্থানান্তরিত হয়েছে। সিরিয়ার কাস্টমস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ট্রাক প্রায় সাত মিলিয়ন টন পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশটির নতুন নেতৃত্ব এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি বাড়ার ফলে বিকল্প পথ হিসেবে সিরিয়ার কৌশলগত স্থল ও সমুদ্রপথের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে বাণিজ্য বাড়াতে শুরু করেছে।
সিরিয়া সরকার এখন পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জর্ডান, সৌদি আরব, সিরিয়া ও তুরস্ক আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ঐতিহাসিক হিজাজ রেলওয়ে পুনর্নির্মাণের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের মতে, এই রেললাইন চালু হলে শুরুতে বছরে ১৫ লাখ কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হবে, যা পরবর্তীতে ৩০ লাখে উন্নীত হতে পারে।
এছাড়া ইরাক ও সিরিয়া কিরকুক-বানিয়াস তেল পাইপলাইন সংস্কারের বিষয়েও সম্মত হয়েছে, যা ইরাকের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালির বাইরে দিয়ে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করবে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করেছেন, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের শতভাগ মালিকানা, লভ্যাংশ নিজ দেশে পাঠানোর স্বাধীনতা এবং ব্যাপক করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তবে এই বিশাল বিনিয়োগ ও মেগা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি প্রেসিডেন্টের দপ্তরের অধীনে থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার অভাবে এটি আসাদ আমলের মতো রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদানের দুর্নীতিকে পুনরায় উসকে দিতে পারে। সিরিয়ার এই অগ্রযাত্রার পথে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মতে, তাদের পাশ কাটিয়ে যেকোনো আঞ্চলিক বাণিজ্যিক করিডর তৈরি করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এরই মধ্যে ইসরায়েল সিরিয়ার বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে দামেস্কের রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধ এখনো পুরোপুরি নিরসন হয়নি। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সিরিয়ায় শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরা এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও আবাসন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। প্রেসিডেন্ট শারার দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, তবে এই অর্থের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো দৃশ্যমান নয়। সিরিয়াকে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কেবল ট্রানজিট ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
