সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাকে 'মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট' বা 'মক্কা চুক্তি' বলা হচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে তিনটি রাষ্ট্র একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা তিন দেশের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
চুক্তিটি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এই কাঠামোর অধীনে সৌদি আরব প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোতে আর্থিক সহায়তা ও তহবিল জোগান দেবে। তুরস্ক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন এবং ডিপ-টেক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান তাদের সামরিক জনশক্তি এবং বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়ে এই জোটের সহযোগিতা করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ দিন পর, ৩১ আগস্ট একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বর্তমানে চুক্তির রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবায়নের উপযোগী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। তবে এই জোটের অধীনে কোনো যৌথ কমান্ড কাঠামো তৈরি হবে কি না, কিংবা নিয়মিত যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অবকাঠামোটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠছে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান যখন এই অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন এই তিন দেশ নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে, তাই তারা পুরোপুরি মার্কিন বলয়ের বাইরে যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ না পেলেও সরকারি পর্যায়ে এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে দেশটিতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে যোগ দিলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং অস্ত্র আমদানির উৎস বহুমুখী হবে।
আবার অনেকে মনে করছেন, এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।
অন্যদিকে, সমালোচকরা মনে করছেন, এই চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী সংঘাতগুলোকে নিজের দেশে টেনে আনতে পারে। চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতার কারণে কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে বাংলাদেশকে সেখানে সেনা পাঠাতে হতে পারে। এছাড়া, এই চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভারতকে উদ্বিগ্ন করেছে, কারণ ভারত এটিকে তাদের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের নীরব উপস্থিতির সুযোগ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনের মাঝে আবর্তিত হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ইঙ্গিত দেয় যে, দেশটির পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কেবল ভারতকেন্দ্রিক নয়। তবে এই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল আবেগের বশে বা অন্য দেশের চাপের মুখে না নিয়ে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
