ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষাকারী কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেক এলাকায় নতুন একটি মহাসড়ক নির্মাণের জন্য আর্থিক অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের একটি নতুন হাইওয়ে নির্মাণ করা হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি জানিয়েছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সরকার ২০৭৭ দশমিক ১৮ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে।
নতুন এই সড়কটি জাতীয় সড়ক ৩২৭ নামে পরিচিত হবে। এটি পানিটাঙ্কি ও খড়িবাড়ি হয়ে বাগডোগরা থেকে বিহারের গলগলিয়াকে সংযুক্ত করবে। বর্তমানে বিদ্যমান জাতীয় সড়ক ২৭-এর সমান্তরালে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে এই নতুন সড়কটি নির্মিত হবে। শিলিগুড়ি করিডোরটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকা।
প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। এই ভূখণ্ডটি নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এবং চীন ও ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়করি জানিয়েছেন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
একই সঙ্গে এটি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দিকে যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করবে। নতুন এই চার লেনের মহাসড়কটি চালু হলে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও পানিটাঙ্কি এলাকার যানজট উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এছাড়া বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হবে।
এর ফলে স্থানীয় কৃষি পণ্য, চা ও উদ্যানপালনজাত পণ্য দ্রুততম সময়ে বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। প্রকল্পের নকশায় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মহাসড়কটির অধীনে তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ এবং হাইওয়ের উভয় পাশে সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হবে। বিশেষ করে কার্শিয়াং বন বিভাগের আওতাধীন এলাকাগুলোতে হাতির নিরাপদ চলাচলের জন্য পাঁচটি বিশেষ আন্ডারপাস তৈরি করা হবে।
দ্রুতগামী যানবাহনের ধাক্কায় বন্যহাতির প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিলিগুড়ি করিডোরের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে ভারত সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর আগে বারাণসী থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত হাই-স্পিড রেলওয়ে করিডোর, শিলিগুড়ির কাছে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং মালদা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত চতুর্থ রেললাইন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় সড়ক ২৭-এর বিকল্প হিসেবে এই নতুন মহাসড়কটি তৈরি হলে কৌশলগত এই অঞ্চলে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
