লেবাননে গত তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৯২০ জনে পৌঁছেছে। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছেন ৩০ হাজার ৫৯৫ জন। শনিবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ওপর হামলার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স ক্রুদের ওপর ১৭৯টি ইসরায়েলি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলায় ১৩৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। ২ মার্চ তারিখটি লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত। ওই দিন বৈরুতে চালানো এক ইসরায়েলি হামলায় ৩১ জন নিহত হন। এর আগে উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়েছিল বলে জানা যায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ২২ হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে সামনে এল যখন দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে।
অথচ জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে বাস্তবে এই চুক্তির কোনো প্রভাব মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়নি। ইসরায়েল গত মার্চ মাস থেকে দক্ষিণ লেবাননে সামরিক দখল বজায় রেখেছে। সে সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সেখানে একটি বাফার জোন বা নিরাপত্তা বলয় তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল।
২৬ জুন যে কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের শর্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। তবে হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি একে অকার্যকর ও বাতিল বলে ঘোষণা করে দাবি জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলকে আগে তাদের দখলদারিত্ব শেষ করতে হবে। উল্লেখ্য যে, ওই চুক্তিতে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল না।
শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের কাফার রেমান শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা কৌশলগত আলী আল-তাহের সেতুর নিচে থাকা সুড়ঙ্গ থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দিয়েছে। একই দিনে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, টায়ার এবং নাবতিহ জেলার সাতটি শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও কামানের গোলাবর্ষণ চালানো হয়েছে।
তবে ওই এলাকাগুলোতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ রোববার ভোরে দক্ষিণ লেবাননের জাওতার আল-শারকিয়াহ এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাত লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর বারবার হামলা এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা দেশটির মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বরং সংঘাতের পরিধি ও তীব্রতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া এই তথ্যগুলো চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।
