যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের অভ্যন্তরীণ সামরিক নথির গোপনীয়তা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার সিস্টেমে কয়েক দশকের শ্রেণিবদ্ধ সামরিক নথিতে প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে যুদ্ধ সংক্রান্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আদেশ ও সিদ্ধান্ত বিষয়ক অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যগুলো খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তি জানতে পারবেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজন ব্যক্তি জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আদেশপত্র সংকলন বা সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স অর্ডারস বুক (এসডিওবি) সম্পর্কিত নথিগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন তথ্যের নিরাপদ নেটওয়ার্ক বা সিক্রেট ইন্টারনেট প্রোটোকল রাউটার নেটওয়ার্ক (সিআইপিআরনেট)-এর অভ্যন্তরীণ ওয়েব পোর্টাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই নথিগুলো এখন আর আগের মতো সহজে দেখা সম্ভব নয়।
তবে এই নথিগুলো সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অন্য কোনো উপায়ে দেখতে পারছেন কি না বা এই পরিবর্তনের ফলে সামগ্রিক সামরিক পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সিআইপিআরনেট মূলত প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি শ্রেণিবদ্ধ সামরিক নেটওয়ার্ক, যেখানে গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
অন্যদিকে, এসডিওবি হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর আদেশপত্র এবং কমান্ডারদের মতামত সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। এতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, সামরিক ইউনিট, অস্ত্রব্যবস্থা এবং অন্যান্য সম্পদের অবস্থান ও প্রাপ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে। এই নথির মাধ্যমে শীর্ষ সামরিক নেতারা কোনো আদেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আদেশের বিষয়ে আপত্তি বা উদ্বেগ নথিভুক্ত করার সুযোগ পান, যাকে সামরিক পরিভাষায় নন-কনকারিং বলা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত ১৪ আগস্টের এসডিওবি নথিতে এই উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে। কমান্ডাররা সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ওই নথিতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনা ইউনিটকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই অঞ্চলে রাখার কথা বলা হয়েছিল এবং অন্য কিছু ইউনিটকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সেখানে রাখার পরিকল্পনা ছিল। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বিষয়ে জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকিউইচ, জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান, অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো ও অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, জেনারেল কেনেথ উইলসবাখ ও জেনারেল ক্রিস্টোফার লানিভ সেনা ইউনিটগুলোর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনায় সম্মতি দিলেও এর সঙ্গে থাকা উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এই পরিবর্তনের বিষয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র সিয়েন পারনেল কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি তথ্যের গোপনীয়তা বৃদ্ধির বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষা বিভাগ তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করে না।
তিনি আরও বলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক সদস্যদের সাফল্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পরিচালনাগত প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মুখপাত্রের দাবি, সামরিক বাহিনীতে বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি বা নন-কনকারিং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিয়মিত এগুলো পর্যালোচনা করেন।
তবে একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিআইপিআরনেট থেকে এসডিওবি সরিয়ে নেওয়া বা উচ্চতর নিরাপত্তাব্যবস্থায় স্থানান্তর করার ফলে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। কমান্ডার এবং তাদের কর্মীরা সময়-সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এসডিওবি-র ওপর নির্ভর করেন। উদাহরণস্বরূপ, এক কমান্ড থেকে অন্য কমান্ডে বিমান ও অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার মতো লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দ্রুত তথ্যের প্রয়োজন হয়।
প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ার ফলে এই প্রক্রিয়া ধীর এবং আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পেন্টাগনের এই পদক্ষেপের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং যুদ্ধকালীন কৌশলগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হলো বলে মনে করা হচ্ছে।
