যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাস ধরে থেমে থাকা সামরিক সংঘাত পুনরায় শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালায় এবং এর জবাবে তেহরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির পর তেহরান এই পাল্টা হামলা চালিয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটিকে আবারও এক বিপজ্জনক সামরিক অচলাবস্থায় ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাম্প্রতিক হামলাগুলো বেশ সীমিত আকারে হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে কোনো পক্ষই এখন সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিতরিনোভিচ জানিয়েছেন যে, এখন পর্যন্ত দুই পক্ষই বেসামরিক নাগরিক বা জ্বালানি অবকাঠামোর চেয়ে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তবে তেহরান সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করেনি।
যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব এখন সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর পড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই পর্যন্ত এই যুদ্ধে ওয়াশিংটনের প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এর ফলে মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানে যুদ্ধের প্রভাব আরও মারাত্মক। দেশটি তেল বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশটির বিপর্যস্ত অর্থনীতি আরও খারাপ হয়েছে।
ইরানিয়ান লেবার নিউজ এজেন্সির হিসাবে, গত জুলাই পর্যন্ত বিগত ১২ মাসে ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ খাদ্য ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে সমস্যায় পড়ছে।
সামরিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিছু নির্দিষ্ট অস্ত্রের সরবরাহে টান পড়েছে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগ এবং 'প্যাট্রিয়ট' ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের বাধার সৃষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ উভয় পক্ষের জন্যই অসহনীয় হয়ে উঠছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন যে, কোনো পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরতে চায় না, তবে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে তারা হরমুজ প্রণালিতে জয় পেয়েছে। দুই মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিয়ে প্রণালি পার করিয়েছে।
তবে, তবে যুদ্ধের প্রভাব কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন জরুরিভাবে সংরক্ষিত তেল বাজারে ছাড়ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ দশমিক ১৪ ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ১৯ ডলার।
এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন যে, এই সংঘাত বন্ধ করা এখন সম্পূর্ণ ইরানের ওপর নির্ভর করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে, তবে ইরানও অবিলম্বে একই পদক্ষেপ নেবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্র্ডাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন না এবং হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ইরানের অর্থনীতির ধস নামার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
আরাশ আজিজি নামের একজন ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন যে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী জানে যে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করলে তাদের সরকারের পতন ঘটতে পারে। তাই তেহরান মাথা নত করার চেয়ে পাল্টাজবাব দেওয়াকেই বেছে নিয়েছে। সিতরিনোভিচ বলেন, ইরান তেলবাহী জাহাজের যাতায়াত ব্যাহত করা অব্যাহত রাখবে এবং প্রণালিতে মার্কিন আধিপত্যের চেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে।
