যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম হাসপাতালের চিকিৎসকরা একজন রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপিত শূকরের একটি কিডনি টানা ২৭১ দিন কার্যকর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। চিকিৎসকদের দাবি অনুযায়ী, মানবদেহে প্রতিস্থাপিত শূকরের কোনো অঙ্গ এত দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকার ঘটনা এটিই প্রথম। এই সাফল্যের মাধ্যমে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জন্য নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
টিম অ্যান্ড্রুজ নামের ৬৬ বছর বয়সী এক রোগীর শরীরে এই কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন, যার ফলে তার কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তার শরীরে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনিটি প্রতিস্থাপন করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পরপরই কিডনিটি স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করে এবং রোগীকে ডায়ালাইসিস যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্তি দেয়। টানা ২৭১ দিন কার্যকর থাকার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে কিডনিটি শরীর থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর টিম অ্যান্ড্রুজকে ৮২ দিন ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অবশেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান, যা বর্তমানে তার শরীরে সঠিকভাবে কাজ করছে।
টিম অ্যান্ড্রুজ জানান, শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন তাকে নতুন জীবন দিয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার আশঙ্কায় ছিলেন। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছিল যে, মানবদাতার কিডনি পাওয়ার তালিকায় তার অবস্থান অনুযায়ী প্রায় সাত বছর সময় লাগতে পারে। অথচ ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের গড় আয়ু সাধারণত পাঁচ বছর হয়ে থাকে।
এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার সময়টি তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ ছিল। শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পাওয়ায় তিনি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের ঝামেলা থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গের তীব্র সংকট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় এক লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন, অথচ বছরে মাত্র ২৫ হাজারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়।
যুক্তরাজ্যেও সাত হাজারের বেশি মানুষ কিডনি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এই সংকট নিরসনে বিজ্ঞানীরা এক প্রাণীর অঙ্গ অন্য প্রাণীর বা মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন। মানুষের শরীরের সঙ্গে অঙ্গের আকার সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় শূকরকে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সাধারণ শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
মানুষের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা শূকরের অঙ্গকে বাইরের বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত আক্রমণ করে, ফলে অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা ইউকাটান প্রজাতির ক্ষুদ্রাকৃতির শূকরের জিনে ৬৯টি পরিবর্তন এনেছেন। এই পরিবর্তনের ফলে শূকরের অঙ্গ মানুষের শরীরের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে এবং রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে।
এছাড়া শূকরের জিনের মধ্যে থাকা সুপ্ত ভাইরাসগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, মানবদাতার কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত শূকরের অঙ্গ সাময়িক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এই সাফল্য ভবিষ্যতে অঙ্গের সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশা প্রকাশ করেছেন।
তবে এই প্রক্রিয়াটি এখনও গবেষণাধীন এবং এর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে টিম অ্যান্ড্রুজের শরীরে মানবদাতার কিডনি কার্যকর থাকায় তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
