ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের বান্দার-ই কুহেস্তাক শহরে মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে ইরান। বুধবার ভোরে কুহেস্তাক শহরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হওয়ার ঘটনার পর এই পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, বুধবার ভোরে কুহেস্তাক শহরের একটি বাড়িতে এই হামলা চালানো হয়। কুহেস্তাক ছাড়াও কোনারাক, বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপের মতো দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী ও দেশটির বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) সমন্বিতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান এবং ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
ইরানের সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে সেনাবাহিনী পরিচালিত বহুসংখ্যক বিস্ফোরক ড্রোন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-জুফরা ও আল-মিনহাদ ঘাঁটিতে আঘাত হানে। আল-জুফরা বিমানঘাঁটি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যা বিমান অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং সামরিক রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।
একই সময়ে বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর রাডার স্থাপনা ও কেন্দ্রগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের প্রিন্স হাসান ঘাঁটিতে আইআরজিসি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়। এই হামলায় মার্কিন বাহিনীর আরকিউ-৪ এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় বেশ কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েকজন পাইলট ও ফ্লাইট ক্রু নিহত হয়েছেন।
ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের স্থলবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা পরিচালনা করে। এই হামলায় মার্কিন বাহিনীর একটি মেরামত কেন্দ্র, সরঞ্জাম সংরক্ষণের কয়েকটি গুদাম এবং একটি গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন কমান্ডের কমান্ড পোস্ট ও আবাসিক স্থাপনা লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর এই ঘটনাগুলোকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, আবাসিক এলাকায় এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা চালানো স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, এই হামলার মাধ্যমে আমেরিকান মানবাধিকারের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, এই অপরাধের জবাব ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ও ব্যাপক আকারে দেওয়া হবে।
কুহেস্তাক শহরে হামলার পর থেকে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের সামরিক বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং নাগরিকদের ওপর হামলার জবাব দিতে বদ্ধপরিকর। এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কৌশলগত অবস্থানগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনার ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
