সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গত ৭ আগস্ট মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মক্কা প্যাক্ট’ বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেন সংকট এবং লোহিত সাগরের অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠিত হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এই জোটের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, রিয়াদে জোটের একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধি প্রথম মহাসচিব হিসেবে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সরকারি পাঠ এখনো প্রকাশিত না হওয়ায় এর সামরিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি ন্যাটোর মতো কোনো স্থায়ী কমান্ড কাঠামো বা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিধান সংবলিত জোট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করবে। এই জোটের সদস্য হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির উল্লেখ করেছেন, এই জোটে যোগদানে বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকি দেখছে না। তবে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ও সদস্যপদের শর্তাবলি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের জন্য এই জোটে অংশগ্রহণের সম্ভাব্য সুবিধার ক্ষেত্রগুলো হলো শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ। সৌদি আরব বাংলাদেশের জনশক্তির অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হওয়া প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার কর্মীর মধ্যে ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি সৌদি আরবে গেছেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন খাত উন্মুক্ত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা বাড়ানোর জন্য পৃথক শ্রমচুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বর্তমানে তেলনির্ভরতা কমিয়ে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে এই বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারে, তবে এর জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও নীতিগত সংস্কার জরুরি। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও নৌপ্রযুক্তিতে তুরস্কের সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশ শুধু সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ গবেষণায় গুরুত্ব দিতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে একই কাঠামোয় কাজ করার সুযোগ পেলে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বিস্তৃত হতে পারে। তবে এই জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো নিরাপত্তাকাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ভারত কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা একটি বড় বিষয়। এছাড়া সামরিক দায়বদ্ধতা নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন। কোনো সদস্যদেশের সংঘাতে বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা দিতে হবে কি না বা চুক্তির ভৌগোলিক সীমা কতটুকু, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্যাক্ট আব্রাহাম অ্যাকর্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক একটি নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত প্রতিটি সম্পর্ককে পৃথক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা এবং কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে পক্ষভুক্ত না করা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লাভ জোটে যোগ দেওয়ার ওপর নয়, বরং যোগদানের শর্তাবলি, সামরিক দায়বদ্ধতা সীমিত রাখা এবং অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোকে বাস্তব চুক্তিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ কূটনীতি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
