বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও পদক্ষেপ থেকে এটি স্পষ্ট যে, উভয় দেশই সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্কের শর্ত ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
২১ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ২২ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা অবশ্যই জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে হতে হবে।
একই সময়ে ২৩ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক বক্তব্যে জানান যে, প্রতিবেশীদের শুধু ভারতের স্বার্থ দেখলে চলবে না, বরং ভারতকেও তাদের প্রতিবেশীদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘ সীমান্ত, নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প সম্পর্কের সুযোগও বেড়েছে। চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যার মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।
তবে এই বিকল্পগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে নতুন কোনো নির্ভরতা তৈরি না হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ১৬ আগস্ট প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ভারত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ পেয়েছে এবং তারা তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, এটি দুই দেশের চলমান আলোচনার একটি অংশ এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি, তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বিচারের দাবি এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ—এই দুই বিষয়কে আলাদাভাবে সামলানোই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা।
মালদ্বীপের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিচারের দাবি বজায় রেখে ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব। এছাড়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
২৩ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, নিরাপত্তা দায়বদ্ধতা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করা।
কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি না ঝুঁকে ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় নয়, আবার ভারতও বাংলাদেশকে ছাড়া তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। তাই দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভারসাম্যই হবে মূল চাবিকাঠি।
পরিশেষে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশই প্রথম’ নীতিটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক ও দূরদর্শী হতে হবে। নতুন বন্ধু তৈরি করা এবং পুরনো সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি এমন কোনো দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা উচিত হবে না, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে।
কূটনৈতিক পরিপক্কতা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এই নতুন পথ চলা শুরু করতে হবে।
