চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং শহরে অবস্থিত ছিলিন মাউন্টেন পার্ক স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে কেবল একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়, বরং এটি শহরটির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। ৪২. ২৪ হেক্টর আয়তনের এই পার্কটি ১৯৭৬ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে এটি সানমিং শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত এই পার্কটি শহরের ব্যস্ত জীবনের মাঝে মানুষের জন্য প্রশান্তির একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এই পাহাড়ের নামকরণের পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৮০ সালে স্থাননাম জরিপের সময় গবেষকরা পাহাড়ের ঢালে একটি প্রাচীন সমাধির ওপর পাথরের ফলক খুঁজে পান।
সেখানে ‘কনফুসিয়াস প্লেয়িং উইথ ছিলিন’ বা ‘কনফুসিয়াস ছিলিনের সঙ্গে খেলছেন’ শীর্ষক একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের সূত্র ধরেই পাহাড়টির নাম রাখা হয় ছিলিন মাউন্টেন। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী চীনা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত প্যাভিলিয়নগুলো দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। হাওরান, চুয়ুন, সানইউয়ান, লিয়ানহুয়া, ফেইশি, ইশান, ইয়াংঝি, ঝুশিউ এবং দংওয়াং প্যাভিলিয়নগুলো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে।
এসব স্থাপনায় সমকালীন চীনা ক্যালিগ্রাফারদের লেখা শিলালিপিও সংরক্ষিত রয়েছে, যা স্থানটিকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। পার্কের ভেতরে রয়েছে ৫৪৩ ধাপের একটি বিশেষ সড়ক, যা ১৯৮৪ সালে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় সম্মেলনের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করা হয়। এই সড়কের দুই পাশে ওসমানথাস গাছ লাগানো হয়েছে, যা পরিবেশকে আরও মনোরম করে তোলে।
এছাড়া ২০০১ সালে নির্মিত ‘সানমিং পিপলস হিরোজ মনুমেন্ট’ বিপ্লবী সংগ্রাম এবং দেশের উন্নয়নের পথে আত্মত্যাগকারী মানুষদের স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভটি শহরের মানুষের কাছে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ছিলিন মাউন্টেন পার্কের পরিবেশগত গুরুত্বও অপরিসীম। বিশাল এই সবুজ এলাকা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গাছপালা শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও ছোট প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিয়মিত শরীরচর্চা, হাঁটা এবং পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এখানে আসেন। ১৯৮০ সালের মধ্য-শরৎ উৎসবে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই পার্কে সমবেত হয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে এই পাহাড়টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের আনন্দ ও উৎসবের অংশ হয়ে আছে।
আধুনিক শহরের কোলাহলের মাঝে এই পার্কটি একটি ‘অক্সিজেন বার’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পারে। পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো সানমিং শহরের দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে আধুনিক উন্নয়ন এবং প্রকৃতির সহাবস্থান স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, এই পাহাড়টি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং এটি শহরের মানুষের স্মৃতির ঠিকানা।
বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে শিশু—সবাই এখানে তাদের অবসর সময় কাটান। বছরের বিভিন্ন ঋতুতে ছিলিন পাহাড়ের রূপ ভিন্ন ভিন্ন হয়। বসন্তে নতুন পাতা, গ্রীষ্মে ঘন সবুজ প্রকৃতি, শরতে নরম আলো এবং শীতে নীরবতা পাহাড়টিকে প্রতিটি ঋতুতে নতুন করে সাজিয়ে তোলে। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের মাধ্যমে পার্কটিকে আরও সমৃদ্ধ করা হয়েছে।
বর্তমানে এটি সানমিং শহরের মানুষের কাছে একটি আপন ঠিকানায় পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক নগরায়ণের মাঝেও ঐতিহ্য ও প্রকৃতির মেলবন্ধন ধরে রেখেছে। পাহাড়ের প্রতিটি পথ, প্যাভিলিয়ন এবং স্মৃতিস্তম্ভ একটি শহরের জীবনযাত্রার গল্প বলে। সানমিংয়ের বাসিন্দাদের কাছে ছিলিন মাউন্টেন পার্ক তাই কেবল একটি পার্ক নয়, বরং এটি শহরের সবুজ হৃদয় এবং ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে।
