অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। বুধবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট আয়োজিত এক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। কাটজ স্পষ্টভাবে জানান, গাজার জনসংখ্যা কমিয়ে ফেলা বা ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়াই সেখানকার একমাত্র সমাধান। তার মতে, এই অভিবাসন ছাড়া গাজার কোনো প্রকৃত সমাধান নেই।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়ার এই বিষয়টিকে প্রায়ই স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন বা মাইগ্রেশন হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তবে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যই হলো ফিলিস্তিনিদের তাদের পৈতৃক ভূখণ্ড থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার এই ধারণাটি ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে এমন একটি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছিলেন। ট্রাম্পের সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারে। এই প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সেই চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গাজা ছাড়তে কাউকে বাধ্য করা যাবে না এবং যারা স্বেচ্ছায় যেতে চান, তাদের ফিরে আসার সুযোগও থাকবে। তবে কাটজের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করেননি।
তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প এই পরিকল্পনাটি বাতিল না করে বর্তমানে হিমায়িত অবস্থায় রেখেছেন। কাটজ আরও বলেন, ইসরায়েল গাজা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আকাশপথ, সমুদ্রপথসহ যেকোনো উপায়ে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে গাজার প্রতিবেশী দেশ মিশর ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের গ্রহণ করতে রাজি নয়। কাটজের ভাষ্যমতে, ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে পারে এমন অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন।
তিনি জানান, এই পরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে এবং শেষ পর্যন্ত গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তার দাবি, সবার স্বার্থেই এই সমাধানটি কার্যকর করা প্রয়োজন। এদিকে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে ইসরায়েল বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া উপত্যকাটির পুনর্গঠনেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পরেও ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিনই হামলার ঘটনা ঘটছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ব্যাপক সমালোচনা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি সরকারের পাশে অবস্থান নিয়েছে। গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে।
ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা গাজার বর্তমান জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
