জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এল নিনো নামক প্রাকৃতিক আবহাওয়া পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে যে, এল নিনো এখন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। এই বছরের শেষ নাগাদ এটি তার সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাবে সৃষ্ট জলবায়ুগত পরিবর্তনগুলো ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সংস্থাটির মতে, এল নিনো একটি স্বাভাবিক জলবায়ু প্রক্রিয়া হলেও এটি বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সাথে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবী বর্তমানে এক অজানা ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বিশ্ববাসীকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রধান সেলেস্তে সাউলো জানিয়েছেন, এই শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।
তিনি কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং পানি ব্যবস্থাপনার মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোর সাথে জড়িত কর্তৃপক্ষকে দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খরা, বন্যা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং এটি নয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির তীব্রতা বাড়ছে। মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাপ্তাহিক তথ্যে দেখা গেছে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.২ থেকে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিছু এলাকায় সমুদ্রের তলদেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাবে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আমাজন অঞ্চলের কিছু অংশে খরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ভারতের মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এল নিনোর এই শক্তিশালী রূপ বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এখন থেকেই এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মোকাবিলায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
