আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গাজা যুদ্ধ, দেশের অর্থনীতি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মতো বিষয়গুলো ইসরায়েলি রাজনীতির মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি কাতারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি কাতারকে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করেন যে, তিনি অতীতে কাতারে হামলা চালিয়েছেন এবং বোমা নিক্ষেপ করেছেন। তিনি এই সামরিক পদক্ষেপকে সঠিক বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন যে, গাজায় চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাতারের কোনো প্রভাব বা ক্ষমতা নেই।
গাজায় মানবিক সহায়তার নামে কোটি কোটি ডলার পাঠানোর বিষয়েও তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, এই অর্থ মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের তত্ত্বাবধানে তা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে সমালোচকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, কাতারের পাঠানো এই অর্থ হামাসকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করেছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাতার কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ গত বছর দোহা ফোরামে জানিয়েছিলেন যে, কাতার থেকে পাঠানো অর্থ হামাসকে দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, কাতারের সব সহায়তা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাজার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই অবগত ছিল।
উল্লেখ্য যে, প্রায় এক বছর আগে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েল হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলায় হামাসের পাঁচ সদস্য এবং কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। সেই সময় হামাসের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত গাজা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য দোহায় অবস্থান করছিলেন। ওই হামলার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এটিকে কাপুরুষোচিত কাজ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তিনি দাবি করেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও সেই সময় এই হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়া ইরান ও পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছিল। কাতারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নেতারা সে সময় দেশটিতে সফর করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আসন্ন নির্বাচনের আগে জাতীয়তাবাদী ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য নেতানিয়াহু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলার কৌশল অবলম্বন করছেন। গাজা যুদ্ধ এবং হামাসের অর্থায়ন নিয়ে চলমান এই বিতর্ক ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর অর্থনীতি এবং যুদ্ধের কৌশল নিয়ে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে এই ধরনের কঠোর মন্তব্য এবং সামরিক পদক্ষেপের সাফাই গাওয়াকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক। ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাতারকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
