ইরানকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামক একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন যে, ইরানের ওপর এই আর্থিক চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগের প্রশংসা করলেও নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করার ঘোষণা দেয়নি। ব্রাসেলসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা জরুরি। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা হলেও এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম বা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি এবং এ জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এই প্রতিবেদনগুলোকে তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপায় নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সহায়তা করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং সহায়তা না করলে যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই চাপের মুখে দক্ষিণ কোরিয়া বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ওয়াশিংটন ইরানের অবশিষ্ট সব আর্থিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। ইরানের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়াই এই মার্কিন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেখানে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই এককেন্দ্রিক চাপের কৌশল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী এই সংকটে সাড়া দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হওয়ায় সেখানে যেকোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে মিত্র দেশগুলোর এমন কৌশলী অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর নীতি বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
