ইরানের ওপর যেকোনো নতুন হামলার ক্ষেত্রে এবার আরও দ্রুত, কঠোর এবং বেদনাদায়ক জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে গত রোববার তিনি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত এলে তার পরিণাম আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি জানান, এখন থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পুরনো নিয়ম আর কার্যকর থাকবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান এই সংঘাতের ছয় মাস পার হলেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। গত জুন মাসে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে সংঘাত অনেকটা অচলাবস্থায় আটকে আছে।
গত জুলাই মাসে সামরিক তৎপরতা কিছুটা কম থাকলেও বর্তমানে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে।
এই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরান তার কৌশলগত সক্ষমতা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি ইরান বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানিতে বাধার কারণে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। দেশটির তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ব্যাপক ওঠানামা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এখন ইরানের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের সামরিক দিকের পাশাপাশি উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবিকা রক্ষা করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ইরানের জনগণ কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করতে অভ্যস্ত, কিন্তু তারা সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে। এই সংকট মোকাবিলায় ইরান সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান তার নীতি পরিবর্তন করবে না। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে চাপে ফেলে জনগণকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করার যে কৌশল যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তা সফল হবে না। ইরানের অর্থনীতি সংস্কারের দায়িত্ব দেশটির সরকার ও জনগণের, অন্য কোনো দেশের নয়। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোরতেজা জামানিয়ান জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সরকার একটি বিশেষ ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ সদর দপ্তর’ গঠন করেছে এবং এর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।
বর্তমানে ইরান দ্বিমুখী চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে যুদ্ধের সামরিক ঝুঁকি এবং অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি। সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং তেল রপ্তানির ওপর চাপ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন বিশ্ববাসীর নজর রয়েছে।
একদিকে কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সামলানোর লড়াই—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
