রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অনড় অবস্থানের কথা জানান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বে ইরানকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
পুতিন স্পষ্ট করেছেন যে, রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগকারী শক্তিগুলোকে তিনি কঠোরভাবে মোকাবিলা করবেন। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পুতিন বলেন, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালানোর নির্দেশ পেয়েছে। তাঁর দাবি, রাশিয়ার এসব হামলার ফলে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের অর্থনীতি ধসিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য না থাকলেও এটি তাদের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পুতিন বলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার আকাশপথ অনিরাপদ হয়ে উঠবে—এমন দাবিকে তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়।
ইউক্রেনের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জাহাজ এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পুতিন। তাঁর ভাষ্যমতে, গত ৪০ দিনে রাশিয়ার প্রায় ১০০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতি দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রগতির দাবি করে তিনি জানান, আগস্ট মাসে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
যদিও যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী ইউক্রেনীয় সংগঠন ডিপ স্টেটের তথ্য অনুযায়ী, এই দখলের পরিমাণ মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে শান্তি আলোচনার বিষয়ে পুতিন জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে এবং তাঁদের মাধ্যমে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব।
সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের বিষয়ে পুতিন জানান, স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা প্রধানদের মধ্যে যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল, বর্তমানে তা কিছুটা স্থগিত রয়েছে। এদিকে, এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পুতিন। তিনি জানান, কঠিন সময়ে ইরানকে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহসহ সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য এবং ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ দিয়ে সহায়তা করছে মস্কো। পুতিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো যদি রাশিয়াকে খাদ্যশৃঙ্খলের নিচে নামিয়ে দিতে চায় বা গ্রাস করতে চায়, তবে তারা দাঁতভাঙা জবাব পাবে। তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যারা ‘ক্ষুধার্ত হাঙরের’ মতো আচরণ করছে, তাদের মোকাবিলায় রাশিয়া পুরোপুরি প্রস্তুত।
যুদ্ধের কারণে রাশিয়ায় নতুন করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা পুতিন ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের সঠিক চিত্র পেতে তাঁর কাছে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য আসে এবং তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোতে রাশিয়ার তৎপরতা অব্যাহত থাকায় বিশ্ববাজারে শস্য রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুতিনের এই কঠোর অবস্থান ইউক্রেন সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
