আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন বিশ্বমানচিত্রে সঠিকভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে একটি নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন জানায়। প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে কেবল একটি দেশ, যা হলো যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ছয়টি দেশ এই ভোটাভুটি থেকে বিরত ছিল।
আফ্রিকার দেশগুলোর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়েছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিল টোগো। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত ষোড়শ শতকের ‘মারকেটর’ মানচিত্রের পরিবর্তে ‘ইকুয়াল আর্থ’ বা সমানুপাতিক পৃথিবী মানচিত্র ব্যবহারের জন্য এই প্রস্তাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর নিকটবর্তী ভূখণ্ডগুলোকে তাদের প্রকৃত আয়তনের চেয়ে অনেক বড় করে দেখানো হয়।
এই মানচিত্রের কারণে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান আয়তনের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। আফ্রিকার দেশগুলোর মতে, মানচিত্রের এই আয়তনগত বিকৃতি আফ্রিকা মহাদেশকে বিশ্বের একটি প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপনের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসেই ভোটাভুটির আগে জানান, একটি ন্যায্য মানচিত্রের মাধ্যমেই একটি ন্যায্য বিশ্ব গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগটি ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার মোকাবিলার একটি অংশ। তবে এটি কোনোভাবেই ইউরোপ বা অন্য কোনো সভ্যতার বিরুদ্ধে পরিচালিত পদক্ষেপ নয়। জাতিসংঘের এই প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। টোগোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমুদ্র ও আকাশপথে পথনির্দেশ বা নেভিগেশনের ক্ষেত্রে মারকেটর মানচিত্রের ব্যবহারে এই প্রস্তাব কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না, কারণ ওই কাজের জন্য মারকেটর মানচিত্র এখনো পুরোপুরি কার্যকর ও উপযোগী।
অন্যদিকে, প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই উদ্যোগটি একটি আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা মাত্র। তাদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের মতো প্রকৃত ও জরুরি সমস্যাগুলো থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে। টোগো সরকার এই মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসেই জানিয়েছেন, টোগো বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তাদের স্কুলের পাঠ্যবই ও শিক্ষা উপকরণে এই নতুন মানচিত্র চালু করতে যাচ্ছে।
এ বছরের শেষ নাগাদ এই পরিবর্তন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া টোগো অন্যান্য সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে মারকেটর মানচিত্রের পরিবর্তে ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করবে। দুসেই মনে করেন, ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র বিশ্বকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্যদেশ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করে এই মানচিত্রের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার উপায় নির্ধারণ করবে টোগো।
এই প্রক্রিয়ায় জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম এবং অন্যান্য অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তি পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেই সাথে আফ্রিকাও তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। মানচিত্রের এই পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা বিশ্বকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ তৈরি করতে চায়।
