আফগানিস্তানে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান সরকার। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করার পর তালেবান পুনরায় দেশটির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে তারা দেশটিকে ইসলামী বা শরিয়া আইনের ভিত্তিতে পরিচালনার ঘোষণা দেয়।
নতুন এই বিধিনিষেধের মাধ্যমে দেশটিতে যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ বা বিক্ষোভ প্রদর্শন আইনত নিষিদ্ধ করা হলো। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন যে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় বিক্ষোভের কোনো স্থান নেই। তিনি বলেন, বিক্ষোভ মূলত এমন সমাজে দেখা যায় যেখানে গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্রের মতো ভিন্ন ধরনের আইন কার্যকর থাকে।
তার ভাষ্যমতে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ কোনো বিক্ষোভ ছাড়াই সরাসরি সরকারের কাছে তাদের অভিযোগ ও উদ্বেগ তুলে ধরার সুযোগ পায়। তিনি আরও দাবি করেন যে, বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার ফলে মানুষের সময়ের অপচয় কমবে এবং ব্যক্তিগত বা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। গত মাসে সরকার এই নতুন বিধানটি জারি করে, যার মাধ্যমে বিক্ষোভের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে বিক্ষোভের ঘটনা এমনিতেই খুব কম ছিল, তবে এই নতুন আইনের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। তালেবানের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত মাসের শেষ দিকে এই নতুন আইনের কঠোর সমালোচনা করে। সংগঠনটির মতে, এটি তালেবানের পক্ষ থেকে ভিন্নমত দমনের একটি নিষ্ঠুর প্রচেষ্টা।
এছাড়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও আফগানিস্তানে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তালেবানের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এই পরিবর্তনগুলো আফগানিস্তানে মানবাধিকারের ওপর ব্যাপক আঘাত হিসেবে গণ্য হবে। তারা তালেবানের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তকে তাদের নেওয়া সবচেয়ে গুরুতর বিধানগুলোর একটি হিসেবে অভিহিত করেছে। আফগানিস্তানে বিক্ষোভের ঘটনা খুব কম হলেও সম্প্রতি নারী অধিকারকর্মীদের প্রতিবাদ সমাবেশে সহিংসতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের একদল বিশেষজ্ঞের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হেরাতে নারী অধিকারের দাবিতে একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ওই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, হেরাতের ওই ঘটনায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। তালেবান সরকারের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, এই ধরনের কঠোর আইন সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করবে। তালেবান সরকার তাদের ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই এই আইনকে দেখছে এবং তারা তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে কোনো ধরনের জনসমাবেশ বা প্রতিবাদ করার সুযোগ আর থাকছে না।
তালেবান মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার তাদের নিজস্ব আইনি কাঠামোর ভেতরেই জনগণের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা রাখবে, তবে রাজপথে কোনো ধরনের বিক্ষোভ তারা আর সহ্য করবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
