ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিতে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আকাশে ছড়িয়ে পড়া আগ্নেয় ছাইয়ের কারণে দেশটির পাঁচটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার ৬ সেপ্টেম্বর সুকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা বন্ধের এই সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। মূলত আকাশপথে উড়োজাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এড়াতে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত শনিবার আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিতে প্রথম বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। এরপর রোববার আরও দুটি অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত আগ্নেয় ছাই জাভা দ্বীপের দিকে প্রায় ছয় হাজার মিটার এবং সুমাত্রা দ্বীপের দিকে প্রায় ১৫ হাজার মিটার উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বান্তেন প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ছাই ছড়িয়ে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা অ্যাংকাসা পুরা জানিয়েছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখন পর্যন্ত মোট ৩০১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট রয়েছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস জাকার্তাগামী এবং জাকার্তা থেকে ছেড়ে যাওয়া তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে।
একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার উড়োজাহাজ সংস্থা কান্তাসও জাকার্তাগামী ও জাকার্তা থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। কান্তাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আবহাওয়াবিদ ও পরিচালনাকারী দলের সদস্যরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দর এলাকায় আগ্নেয় ছাইয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পরই বিমান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এখন পর্যন্ত ২২ হাজারের বেশি যাত্রী এবং ২০৯টি ফ্লাইট সরাসরি এই পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চলাচলকারী ফ্লাইটগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। এছাড়া দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরের আন্তর্জাতিক রুটেও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। বালিগামী অন্তত ১৬টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
আগ্নেয় ছাইয়ের প্রভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। গত শনিবার ছাইয়ের কারণে বেশ কিছু স্কুলের কার্যক্রম বাতিল করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের চোখে জ্বালাপোড়ার মতো শারীরিক সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সমুদ্র উত্তাল থাকায় এবং ছাইয়ের কারণে জেলেদের সমুদ্রে মাছ ধরার পরিকল্পনাও বাতিল করতে হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সহায়তায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যাত্রীদের খাবার ও হালকা নাশতা সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের হোটেলে নেওয়ার জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবি জানিয়েছে, আকাশ থেকে আগ্নেয় ছাই দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে রোববার কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্লাউড সিডিংসহ আবহাওয়া পরিবর্তনের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিএনপিবি প্রধান সুহারইয়ান্তো জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত ভারী বৃষ্টি হলে আগ্নেয় ছাই দ্রুত ধুয়ে যাবে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তৈরি হওয়া বিঘ্ন কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝের প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিটি ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’ হিসেবে পরিচিত।
১৮৮৩ সালের ভয়াবহ ক্রাকাতোয়া অগ্ন্যুৎপাতের পর সমুদ্রের নিচে তৈরি হওয়া গহ্বর থেকে এই আগ্নেয়গিরিটি ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। ঐতিহাসিক সেই অগ্ন্যুৎপাতকে মানব ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যাতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এরপর থেকেই আনাক ক্রাকাতোয়া মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এর ফলে সৃষ্ট ছাই ও ধোঁয়া প্রায়ই আঞ্চলিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রেখেছে।
