হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় সৌদি আরবের মালিকানাধীন একটি জ্বালানি তেলবাহী সুপার ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ট্যাংকারটিতে কর্মরত ফিলিপাইনের দুজন নাবিক নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের জাতীয় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাহরি’ বুধবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ‘সিদর’ নামের জাহাজটি এই নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়ে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থানকালে জাহাজটিতে কয়েকটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের এই অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এর আগে ইরান দাবি করেছিল যে, হরমুজ প্রণালিতে দুটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে আগুন লেগেছে।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, ওই ট্যাংকার দুটি হরমুজ প্রণালিতে অনুমোদিত নয় এমন পথ দিয়ে চলাচল করছিল। একই সময়ে মুসানদামের পূর্বাঞ্চলে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের আরেকটি সুপার ট্যাংকার আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল যখন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা জোরদার করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। গত জুলাই মাসের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটিতে ১৮ জন নিহত এবং ১০৮ জন আহত হয়েছেন। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তেহরান এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে, এসব হামলার বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনগুলো তারা খতিয়ে দেখছে।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলারও নিন্দা জানিয়েছে রিয়াদ। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উত্তেজনা কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সৌদি আরব বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় এই এলাকায় যেকোনো ধরনের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমানে এই অঞ্চলে চলমান সামরিক অস্থিরতা এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলো পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না। ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
