হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ট্যাংকার দুটি বিস্ফোরণের ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকার দুটি ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ ব্যবহার না করে একটি অনুমোদনহীন পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল।
এই পথ পরিবর্তনের সময় মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত ট্যাংকার দুটিতে আগুন জ্বলছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে এই বিস্ফোরণের ঘটনার আগে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের বান্দার-ই কুহেস্তাক শহরে হামলার ঘটনা ঘটে।
আইআরজিসির ভাষ্যমতে, ওই এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান এবং বেশ কিছু আবাসিক এলাকায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় এক শিশুসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া এই ঘটনায় আরও ৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের পাঁচটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক হামলা পরিচালনা করেছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত, যা দিয়ে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণ এবং ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইআরজিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ট্যাংকার দুটি মার্কিন এজেন্টদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল এবং তারা ইরানের নিরাপত্তা প্রটোকল অমান্য করে চলাচলের চেষ্টা করেছিল।
বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ট্যাংকার দুটির আগুন নেভানোর বিষয়ে কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা তাদের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং নির্ধারিত নৌপথের বাইরে কোনো ধরনের অননুমোদিত চলাচল সহ্য করা হবে না। এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা ও নজরদারি আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। হরমুজগান প্রদেশের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়েও আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে।
আহত ৬৩ জনের চিকিৎসা চলছে এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলার কঠোর নিন্দা জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত ট্যাংকার দুটির অবস্থান এবং সেগুলোর মালিকানা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে যে, তারা এই ঘটনার তদন্ত করছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও ইরান কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণ এবং এর আগের হামলার ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না, বরং পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে, যদিও মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তপ্ত।
