তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যেপ এরদোয়ান চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা জোট সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তিনি এই আগ্রহের কথা জানান। বর্তমানে তুরস্ক এই সংস্থার একটি ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে কাজ করছে।
তবে এরদোয়ান জানিয়েছেন, তিনি এই জোটের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর বিশকেকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। বুধবার ২ সেপ্টেম্বর কিরগিজস্তান থেকে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করেন যে, এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার অর্থ এই নয় যে তুরস্ক তার অন্যান্য আন্তর্জাতিক জোট বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
তিনি বলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি বহুমুখী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করা তাদের লক্ষ্য। সম্মেলনের ফাঁকে এরদোয়ান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, এই বৈঠকে দুই নেতা প্রধানত কৃষ্ণসাগরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শস্য পরিবহনের বিষয়টি এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এরদোয়ান সাংবাদিকদের বলেন, কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন যে, চলমান সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে আফ্রিকায় শস্য সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এর আগে জানিয়েছিলেন যে, কৃষ্ণসাগরের মাধ্যমে নিরাপদে শস্য পরিবহনের জন্য তুরস্ক একটি নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এ বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
তবে এই বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। বুধবার ২ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার গ্রুশকো মন্তব্য করেন যে, কৃষ্ণসাগরীয় শস্য চুক্তি পুনরায় চালুর জন্য বর্তমানে কোনো ভিত্তি বা অনুকূল পরিবেশ দেখছে না মস্কো। এরদোয়ান তার বক্তব্যে পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, শস্য সংকট মোকাবিলায় এবং কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে তুরস্ক তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
তিনি মনে করেন, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতেও বেসামরিক নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এটি সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। বিশকেক সফর শেষে ফেরার পথে তিনি এই বিষয়টিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তুরস্কের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ দেশটি একই সঙ্গে ন্যাটো জোটের সদস্য এবং এসসিওর মতো জোটের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে।
এরদোয়ানের এই অবস্থান তুরস্কের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে। কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা এবং শস্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে তুরস্কের এই সক্রিয় ভূমিকা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক মহলে আরও আলোচনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে শস্য চুক্তি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাওয়ায়, এই সংকট নিরসনে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এই সফর এবং এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ঘোষণা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুরস্ক তার ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখাই এখন তুরস্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
