রাশিয়া কর্তৃপক্ষ দেশটির অভ্যন্তরে পরিচালিত সব জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। জার্মানির লাইপজিগ/হলে বিমানবন্দরে হামলার চেষ্টার অভিযোগের প্রেক্ষিতে জার্মান সরকার দেশটির বন শহরে অবস্থিত রুশ কনস্যুলেট এবং বার্লিনে অবস্থিত রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর রাশিয়া এই পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করল।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন যে, মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং ইয়েকাতেরিনবার্গে গ্যেটে ইনস্টিটিউট পরিচালিত জার্মানির সব সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। ভ্লাদিভস্তকে আয়োজিত ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামের এক অনুষ্ঠানে লাভরভ দাবি করেন, রাশিয়া যদি এই পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ না করত, তবে তা মস্কোর আত্মসম্মানের জন্য ক্ষতিকর হতো।
তিনি আরও বলেন, জার্মানি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে রাশিয়ান হাউস সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করার পরিণতি কী হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাশিয়ায় দীর্ঘদিনের জার্মান সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল। গত ৪ আগস্ট লাইপজিগ/হলে বিমানবন্দরে ইউক্রেনের একটি উড়োজাহাজের কাছে বিস্ফোরকভর্তি একটি ড্রোন পাওয়া যায়। নিরাপত্তা বাহিনী পরবর্তীতে ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়।
লাইপজিগ/হলে বিমানবন্দরটি ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনার পর জার্মান সরকার রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল জানিয়েছেন, বার্লিন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এখন রাশিয়াকে তাদের সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করতে হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন কমিয়ে আনা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে নাশকতামূলক ও বিভ্রান্তিকর তৎপরতা চালিয়ে আসছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, জার্মানি নিজের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা এবং ভোটারদের অসন্তোষ থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়ার ওপর দায় চাপাচ্ছে।
পুতিনের মতে, মস্কোর বিরুদ্ধে সাজানো প্রমাণ হাজির করা হচ্ছে। লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চেষ্টার ঘটনার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আয়ারল্যান্ডে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে রাশিয়াকে মোকাবিলার নতুন উপায় খুঁজে পেতে মন্ত্রীরা হিমশিম খাচ্ছেন।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই ড্রোন হামলার চেষ্টার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসের সব লক্ষণ বিদ্যমান রয়েছে। এখন ইইউ জোটের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, তারা এর বিপরীতে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বৈঠকে মন্ত্রীরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ভিসা বিধিনিষেধ কঠোর করা এবং রুশ কনস্যুলেটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাশিয়ার তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তা, ধনী ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কাজা কালাস জানিয়েছেন, আরও ১ হাজার ৬০০ ব্যক্তির ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং তাদের সম্পদ জব্দ করার মতো নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
জার্মানি বারবার দাবি করেছে যে, তারা রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি। এরপরও নিয়মিতভাবে ক্রেমলিনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে তাদের। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল একই সঙ্গে ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়াকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে এবং এই উত্তেজনার দ্রুত অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
