নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উত্তর আমেরিকা থেকে তাদের সংরক্ষিত কয়েক টন সোনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, এই স্থানান্তরের ফলে তারা যেকোনো গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন সোনার মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যাতে সংকটময় পরিস্থিতিতে মূল্যবান এই ধাতু সহজে ব্যবহার করা যায়।
এই বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে আনা সোনা এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে। ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন জানিয়েছেন, তারা আশা করেন যে এই সোনা ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না, তবে দেশের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়ায় লন্ডনকে সোনা সংরক্ষণের জন্য সেরা বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। কোনো সংকটের সময় দ্রুত সোনা কেনাবেচা করার জন্য লন্ডন সবচেয়ে উপযোগী স্থান বলে ব্যাংকটি মনে করে।
নেদারল্যান্ডসের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোও একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করছে। ফ্রান্স এই বছরের শুরুতে ঘোষণা করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের সোনার রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। জার্মানির বুন্দেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি সোনা স্থানান্তর করেছে, যার মধ্যে ১১১ টন নিউইয়র্ক থেকে এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে সরানো হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যগত উত্তেজনা এই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে প্রভাব ফেলেছে, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে সোনা রাখা এসব বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে। কাভাতোনি মনে করেন না যে কোনো আসন্ন বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে আরও সচেতন হচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেন জানিয়েছেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার একটি অংশ নিউইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল। তাদের মতে, কোনো দেশের সোনা কোথায় সংরক্ষণ করা হবে তা এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের চিন্তার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে তারা উল্লেখ করেছেন যে, দেশে সোনা সংরক্ষণ করতে শারীরিক নিরাপত্তা, নিরীক্ষা অবকাঠামো এবং বীমায় বিনিয়োগের মতো বাড়তি খরচ হয়, যা ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে।
সোনা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন সোনা বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ নতুন মজুত কিনেছে। এর ফলে ওই পরিমাণ সোনা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়েনি। তবে ২৭ টনের বেশি সোনা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে বাহ্যিকভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা জাইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কাভাতোনি জানান, সোনা স্থানান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো এক জায়গায় বিক্রি করে অন্য জায়গায় কেনা। তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যাংক নিউইয়র্কে সোনা রাখতে চায় কিন্তু তা লন্ডনে থাকে, তবে তারা লন্ডনে তা বিক্রি করে একই সময়ে নিউইয়র্কে কিনতে পারে। এতে কোনো লজিস্টিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না।
সীমান্ত পেরিয়ে সোনা পরিবহনের কাজ করা প্রতিষ্ঠান ব্রিংক’স গ্লোবাস সার্ভিসেস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সোনা স্থানান্তরের চাহিদা বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার জানিয়েছেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে সোনার গুরুত্ব বাড়ার কারণে এই প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে এক হাজার টন সোনা সংগ্রহ করেছে, যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ। এই প্রবণতার মূল কারণ হিসেবে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
