যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত অবসানের কোনো কার্যকর পথ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে এই সংঘাতের সূচনা হয়, যা বর্তমানে সপ্তম মাসে গড়িয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। গত জুন মাসে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে সেই নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের নতুন ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়ে ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনাকারী দেশগুলোর ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা বন্ধ করা। তবে এই অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল জানান, ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তার মতে, মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে পরিস্থিতি স্থবির রাখতে আগ্রহী এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে চায়। তবে ইরান বড় ধরনের রাজনৈতিক ছাড় ছাড়া কোনো সমঝোতায় আসতে রাজি নয়, যা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি মনে করেন, মার্কিন হামলার ফলে ইরানের মূল কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তেহরান তাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোর আনুপাতিক জবাব দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও ইরান আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগের সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসুক অথবা কোনো ধরনের ছাড় প্রদান করুক। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন জানান, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। তার মতে, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করছে না, ফলে এই অবরোধের কার্যকারিতা সীমিত।
হপটন মনে করেন, গত জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়াই ছিল সংঘাত থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তিনি উল্লেখ করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের ক্ষমতা হ্রাস পেত এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতো। তবে বর্তমানে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে সেই কৌশলগত ধৈর্য ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।
ফলে সংঘাতটি একটি বিশৃঙ্খল ও অমীমাংসিত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হলেও, সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এই সংঘাতের কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান নিকট ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
