যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এই হুমকিটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এসেছে।
পিকঅ্যাক্স পর্বত, যার স্থানীয় নাম কুহ-ই কোলাং গাজলা, ইরানের ইস্পাহান প্রদেশে অবস্থিত। এটি রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পাহাড়ের গভীরে শক্ত গ্রানাইটের কয়েক শ মিটার নিচে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
ধারণা করা হয় যে, এই স্থাপনার মূল কক্ষগুলো অন্তত ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি জানিয়েছে, পিকঅ্যাক্স পর্বতের পারমাণবিক কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পরিচিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার আশঙ্কা থেকেই পাহাড়ের ভেতরে এই অঘোষিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে।
পিকঅ্যাক্স পর্বতের গুরুত্বের বড় কারণ হলো এটি এখনো অক্ষত রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ফোর্দো, নাতাঞ্জ এবং ইস্পাহানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পিকঅ্যাক্স পর্বত অক্ষত ছিল। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি জানিয়েছে, শুধু খনন করা মাটি ও পাথরের স্তূপের কাছে একটি গাড়ি ধ্বংস হয়েছিল।
চলমান যুদ্ধেও স্থাপনাটির বড় কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায় না।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই পাহাড়ের ভেতরের সুড়ঙ্গগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরানের অন্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভেতরের সুড়ঙ্গগুলোতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, সেন্ট্রিফিউজ তৈরি বা যন্ত্রাংশ সংযোজনের কাজ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ সেখানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্যটি নিশ্চিত করেনি।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের হিসাবমতে, ২০২৫ সালের হামলায় নাতাঞ্জ এবং ফোর্দোর চালু থাকা প্রায় ১৮ হাজার সেন্ট্রিফিউজের অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কয়েকটি স্থাপনা এবং ইস্পাহানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর প্রবেশপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রায় চার হাজার সেন্ট্রিফিউজ তখন স্থাপন করা হলেও চালু ছিল না, সেগুলোর কিছু অক্ষত থাকতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বর্তমানে স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকেরা বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করতে পারেননি। ধারণা করা হয় যে, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য এই ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হবে।
তবে সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সেন্ট্রিফিউজ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা করা যাচ্ছে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের হামলার পর দাবি করেছিলেন যে, ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয় যে, স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদের হাশেমি জানিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক দুই দফা হামলায় ইরানের কতটা ক্ষতি হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা কয়েক মাস ধরে থমকে আছে। ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পিকঅ্যাক্স পর্বতের ওপর ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
