প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতির ধারণা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গ্যালাপের সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক মনে করেন যে সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এই হার গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি এবং গত ২০ বছরের মধ্যে জনগণের এই অনাস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মার্কিন ফেডারেল সরকারের প্রতি জনগণের এই আস্থার সংকট এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন দেশটির বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা এমনিতেই সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি দুর্নীতির বিষয়ে এই নেতিবাচক ধারণা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
চলতি বছর ৯১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন যে সরকারি দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অথচ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বছরে এই হার ছিল ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যে সরকারি দুর্নীতি নিয়ে ধারণা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, যা ২০২৪ সালের ৮৭ শতাংশের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, ক্ষমতায় কে আছেন তার ওপর নির্ভর না করেই সরকারি দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ব্যাপক। এই পরিস্থিতির পেছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ২২০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছেন এবং ২০২৪ সালে তার ঘোষিত আয় ছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার।
তার আয়ের একটি বড় অংশ প্রচলিত ব্যবসার বাইরে বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ব্যবসা থেকে আসছে, যার মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসাও অন্তর্ভুক্ত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান তার প্রধান ক্রিপ্টো কোম্পানির প্রায় অর্ধেক কিনে নেওয়ার পর মার্কিন নীতিতে বিদেশি প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্পের পোস্ট আগে দেখার সুযোগ দেওয়ার নতুন পরিকল্পনা থেকেও তিনি অর্থ আয় করছেন, যা অনেক সময় বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারাও বারবার ট্রাম্পের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেমি রাসকিন নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ক্রিপ্টো খাতের ওপর প্রতারণা ও জালিয়াতি ঠেকাতে তৈরি কিছু নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার ফলে ট্রাম্প ও তার পরিবার উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে।
তবে এই বিতর্ক শুধু প্রেসিডেন্টকে ঘিরেই নয়, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় শেয়ারবাজারে লেনদেন করে বিপুল অর্থ উপার্জন করা নিয়ে কংগ্রেসের অনেক সদস্যও বর্তমানে প্রশ্নের মুখে রয়েছেন। এই বিষয়ে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ডেভিন ইনগেল জানান, ট্রাম্প পুরো ফেডারেল সরকারের প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছেন। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনছেন এবং করদাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করছেন।
মুখপাত্র আরও অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা সরকারি অপচয়, দুর্নীতি ও অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মানুষ মনে করছেন তাদের সরকারগুলো আগের তুলনায় কম দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ৩৮টি সদস্য দেশের মধ্যে সরকারি দুর্নীতি ব্যাপক বলে মনে করার মধ্যম হার ২০০৯ সালে ৬৯ শতাংশ ছিল, যা ২০২২ সালের পর থেকে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঠিক বিপরীত। প্রথমবারের মতো ওইসিডিভুক্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রেই সরকারি দুর্নীতির ধারণা সবচেয়ে বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে।
