যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ইরান যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরান সংঘাতকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপান্তর না করার কৌশল গ্রহণ করেছে। রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার প্রচেষ্টায় রয়েছে, যেখানে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমতের নেতিবাচক প্রভাব তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, বিপরীতে ৬৩ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করছেন। সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সামরিক শক্তির পূর্ণ ব্যবহারের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল বেছে নিয়েছে।
গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যরত ৬০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশকেও তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে, যা ইরানের তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান যুদ্ধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন।
তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি চলছে না এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের প্রভাব ক্রমশ কমছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই দাবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের তথ্যের পূর্ণ মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি অবস্থান বজায় রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান অর্থনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং পাল্টাপাল্টি হামলার প্রতিটি ঘটনা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
পলিটিকোর জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন এই যুদ্ধের কারণে তাদের পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথকে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান গতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয় এবং এটি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাতে সাম্প্রতিক এক মার্কিন হামলায় শিশুসহ অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, ওয়াশিংটন কৌশলগত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং সামরিক হস্তক্ষেপ এড়াতে গিয়ে বারবার ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে।
ইরানের নিজস্ব হিসাব-নিকাশও যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তেহরান মনে করছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের পর যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে পারেন। ফলে নির্বাচনের ঠিক আগে ইরান নিজেরাই সংঘাত বাড়িয়ে মার্কিন প্রশাসনের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে বড় প্রভাব ফেলবে। রিপাবলিকানরা জয়ী হলে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে কংগ্রেসের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হবে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা নির্বাচনের পর সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানা গেছে। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ইরান যুদ্ধ সাত মাসে গড়িয়েছে এবং এর সমাপ্তি নিয়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন নভেম্বর পর্যন্ত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
উভয় পক্ষই সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেও, যেকোনো ভুল পদক্ষেপ বা নতুন কোনো হামলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। ইরান তাদের ড্রোন প্রযুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের সক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।
